| |
গানের পর গানে বাংলাদেশের, বাংলা ভাষার সঙ্গীত জগত মাতিয়ে
চলেছেন সাবিনা ইয়াসমিন। তার কন্ঠপ্রতিভায় কে হননি মুগ্ধ, কে নন
সন্মোহিত? এবারের তাকে নিয়েই আমাদের এই আয়োজন...
আজও তিনি গাইছেন। তার অসাধারণ কন্ঠ-মাধুর্য ও বিপুল মানসিক
শক্তি হার মানিয়েছে সময়ের ধর্মকে। বাংলাদেশের গানের আকাশে
তারকার দীপ্তি ছড়িয়ে একনো শ্রোতার হৃদয়ে আনন্দ দিয়ে চলেছেন ‘আট
কোটি ফুল’, ‘জন্ম আমার ধন্য হলো’, ‘একটি বাংলাদেশ’-এমন চমৎকার
সব গানের শিল্পী সাবিনা ইয়াসমীন। সেগুনবাগিচার ফ্ল্যাটের
সুসজ্জিত ড্রইংরুমে গরম চায়ের পেয়ালার চুমুক দিতে দিতে জানা
গেল তার দীর্ঘ ৪৭ বছরের সংগীতজীবনের দীর্ঘ পরিক্রমার টুকরো
টুকরো গল্প। শুরুতে গানের সেকাল ও একাল সম্পর্কে মন্তব্য করতে
অনুরোধ জানানো হলে শিল্পী মৃদু হেসে বললেন, ‘সময়কে ফিরিয়ে আনার
তো উপায় নেই। তবে, কালজয়ী সৃষ্টি বলতে কিছু নিশ্চয়ই আছে।’
তার মতে দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের শিল্পিত প্রয়োগ ও গুণী সঙ্গীত
পরিচালকদের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে দিনে সৃষ্টি হতো অপূর্ব সব
গান। পক্ষান্তরে বর্তমান যুগের মানুষ চটজলদি সাফল্য অর্জনে
আগ্রহী। তাই ক্ষণস্থায়ী সাফল্য জুটলেও কালজয়ী শিল্প-সৃষ্টি আর
হচ্ছে না। সহজাত কন্ঠ-প্রতিভার অধিকারী সাবিনার পারিবারিক আবহ
ছিল সঙ্গীতময়। মা মৌলুদা খাতুন মিডিয়ায় না গাইলেও ছিলেন সুকন্ঠী
ও সঙ্গীতানুরাগী। আইনজীবী বাবা লুৎফর রহমানও ভালোবাসতেন গান।
মা-বাবার সঙ্গীতানুরাগ এবং তিন শিল্পী সহোদরার (ফরিদা ইয়াসমীন,
ফৌজিয়া খান ও নিলুফার ইয়াসমীন) কন্ঠ সাফল্য সাবিনাকে শৈশবেই
অনুপ্রাণিত করে। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতজ্ঞ পি সি গোমেজের কাছে
দীর্ঘকাল তালিম নিয়েছেন তিনি। এক সময়ের ঢাকা বেতারের খেলাঘরের
শিশুশিল্পী থেকে আজকের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সাবিনা
ইয়াসমীন এক সুদীর্ঘ ইতিহাস, যার সূচনা সিএটি ক্যাট দিয়ে।
মজার ব্যাপার, ছায়াছবির নেপথ্য কন্ঠশিল্পী হিসেবেই সাবিনার
প্রথম আত্মপ্রকাশ। ফেরদৌসী রহমানের সহশিল্পী হিসেবে ষাটের
দশকের শুরুতে ‘নতুন সুর’ ছায়াছবিতে প্লেব্যাক করেন শিশু সাবিনা।
এদিকে ঢাকা বেতারের আঞ্চলিক পরিচালক আলীমুজ্জামান ‘খেলাঘর’ থেকে
তাকে কিছুতেই ছাড়তে চাইছিলেন না। কিন্তু কিশোরী সাবিনা তখন
অস্থির সিনেমায় গান গাওয়ার জন্য। ষাটের দশকের শেষ দিকে জহির
রায়হানের ‘আগুন নিয়ে খেলা’ ছবিতে গাওয়ার সুযোগ এল। গাইলেন
‘একটি শালিক দুপুর রোদে’ ও মাহমুদ উন নবীর সঙ্গে ‘মধু
জ্যোৎস্নার দীপালি’। দুটিই সুপারহিট হলো। ফিল্মে এটা তার
দ্বিতীয় প্লেব্যাক। আর কাজী জহিরের ‘অবুঝ মন’ ছবিতে ‘শুধু গান
গেয়ে পরিচয়’ গাওয়ার পর কেবল এগিয়ে চলা। তার তৃতীয় প্লেব্যাক এটি।
সময় সত্তরের দশক। তিনি এখন ঠিক মনে আনতে পারেন না কটি সিনেমায়
কত গান করেছেন। তবে তার মনে পড়ে, মাহমুদুন্নবীর সঙ্গে গাওয়া
তার গানগুলো দারুণ জনপ্রিয় হয়েছিল। ছায়াছবির কন্ঠশিল্পী হয়ে
ওঠার পেছনে যাদের অবদান তার কাছে স্মরণীয় হয়ে আছে, তারা হচ্ছেন
জহির রায়হান, আলতাফ মাহমুদ, আলী হোসেন, খান আতাউর রহমান, সুবল
দাস, সত্য সাহা, আলাউদ্দনি আলী ও আজাদ রহমান।
কথোপকথনের এক পর্যায়ে শিল্পীর সঙ্গীতজীবনের কোনো সেরা স্মৃতির
গল্প শুনতে চাইলে সাবিনা কয়েক মুহূর্তের নীরবতার পর জানান,
সালটা ছিল ১৯৭৪। প্রতিবেশী দেশ ভারতে আয়োজিত হয়েছিল ‘বাংলাদেশ
চলচ্চিত্র উৎসব।’ উৎসবে বাংলাদেশ থেকে যারা যোগ দেন তাদের
প্রত্যেকেই ছিলেন অভিনয় অঙ্গনের। অথচ শিল্পী-সঙ্গী হিসেবে
সাবিনাকে তারা দলভুক্ত করেছিলেন। মুম্বাইয়ের (তখনকার বোম্বে)
তাজমহল হোটেলে দুই দেশের প্রখ্যাত সব শিল্পী-ব্যক্তিত্বের
বর্ণিল সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেখানে তরুণী সাবিনা তার
মধুকন্ঠের জাদুস্পর্শে বিমোহিত করেছিলেন উপমহাদেশের এক
প্রাতঃস্মরণীয় সঙ্গীতব্যক্তিত্ব শচীন দেব বর্মণকে। বিমোহিত
শচীন সাবিনাকে উপহার দিয়েছিলেন তার নিজের হাতে লেখা অমূল্য
স্বীকৃতি ‘বাংলাদেশের সাবিনা ইয়াসমীনের গান শুনে মুগ্ধ হলাম’।
একই দিন লতা মুঙ্গেশকরও তার গানের ভুয়সী প্রশংসা করেন।
উল্লেখ্য, আশির দশকে ভারতের একটি বিশ্ববিদ্যালয় সাবিনাকে তার
সঙ্গীত প্রতিভার স্বীকৃতি হিসেবে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি
দেয়। এই বিশেষ সম্মানের অধিকারী হয়েছিলেন উপমহাদেশের আর এক
প্রাজ্ঞ সঙ্গীতব্যক্তিত্ব ভূপেন হাজারিকা। আলাপের এক পর্যায়ে
এসে গেল কবীর সুমন প্রসঙ্গ। তার জীবনসঙ্গীর সঙ্গীত-প্রতিভার
উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করলেন। একজন সত্যিকার শিল্পী হয়ে ওঠতে
সুকন্ঠ ও অধ্যবসায়ের পাশাপাশি আর কোন কোন গুণ থাকতে হয়? জবাবে
সাবিনা জানালেন, ‘শিল্পীকে সূক্ষ্ম অনুভূতিসম্পন্ন ও বিনয়ী হতে
হবে।’
আজকাল গানের কথায় বাহ্যিক মাধুর্য কেন ভীষণভাবে কমে গেছে, এমন
প্রসঙ্গে বললেন, ‘যারা আজকাল গান লিখছেন, মানে এসব সোকলড
গীতিকারের বেশির ভাগই সঙ্গীতশিল্পের সত্যিকার সেবক নন।
এন্টারটেননমেন্ট শব্দের কোনো ইতিবাচক অর্থ তাদের জন্য নেই।’
আরও যোগ করলেন, ‘আমাদের সময় মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, আহমেদ
জামান ইউসুফ, কে জি মোস্তফা, কবি শামসুর রাহমান, গাজী মাজহারুল
আনোয়ার, আবু হেনা মোস্তফা কামাল এবং সুসাহিত্যিক সৈয়দ শামসুল
হক গান লিখতেন। এদের সমপর্যায়ের গীতিকার আমরা চাইলেই পেতে পারি
না। সুশিক্ষিত না হলে গীতিকাররা অনুভূতির সৌন্দর্য ফোটাবেন
কেমন করে!’
পুরনো গানের রিমেক প্রসঙ্গে শিল্পীর কথা হলো, ‘যার সূক্ষ্ম
সুরজ্ঞান নেই, সে শুধু শুধু রিমেক ঝুঁকি নিলে ভুল করবে।’ কথায
কথায় ব্যক্তি সাবিনার পছন্দ-অপছন্দ সম্পর্কেও কিছু তথ্য সংগ্রহ
করা গেল। তার পছন্দের রঙ উজ্জ্বল লাল। সাধারণ বাঙালি খাবারই
তার কাছে সুস্বাদু। পোশাক হিসেবে শাড়িই তার প্রিয়।
শিল্পী সাবিনা ও ব্যক্তি সাবিনার মাঝে কোনো দ্বন্দ্ব নেই।
বিদায় মুহূর্তে নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য টিপস চাইলে
স্নেহের সঙ্গে উচ্চারণ করলেন, ‘নতুনদেরকে আমি শুধু এটুকুই বলব
যে তোমারা বেশি বেশি গান শোনো ও কন্ঠ অনুশীলন করো।’ |