|
আমি নিজেকে শিল্পীর জায়গায় দেখতে
চাই : রোকেয়া প্রাচী |
 |
তারকা বা নায়িকা হওয়ার মানসিকতা কখনোই ছিল না রোকেয়া প্রাচী।
সব সময়ই তিনি শিল্পী হতে চেয়েছেন। আর তাই নানারঙের চরিত্রে
নিজেকে রাঙিয়ে তুলেছেন। মঞ্চ, টিভি নাটকের পাশাপাশি তিনি
ভিন্নধর্মী কয়েকটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করে নিজের পরিচিতিকে
তুলে ধরেছেন বিশ্ব দরবারেও। বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন
অনেক কিছুই...
আপনার অভিনয় তো অনেককেই মুগ্ধ করে। নিজের কাজ নিয়ে আপনি
কি মুগ্ধ হন?
আমার অভিনয় আমাকে যতটা না মুগ্ধ করে তার চেয়ে বেশি
পীড়িত করে। আমি যদি আমার অভিনয়ে মুগ্ধই হতাম তাহলে আমার
এগোনোর পথ থাকতো না। আমার প্রতিনিয়তই মনে হয়, কালকে যে
কাজটা করলাম তা আরো ভালভাবে করা যেত। আমরা শিল্পীরা আসলে
এক্সপেরিমেন্টাল হতে চাই, করতে চাই।
আমাদের এখানে প্রোডাকশনের বাজেট, ডিজাইনটা এরকম যে অনেক
সময় তা করা যায় না। অবশ্য এক্সপেরিমেন্টের জন্য নানাভাবে
নিজে ভাঙার সময়ও কম থাকে। এই যে, বারবার ভাল কিছু করার
প্রেরণা শিল্পীদের মধ্যে আঘাত করে, এই আঘাতটা না থাকলে
শিল্পীতো চেষ্টা করবে না।
অনেকের কাজ দেখলে মনে হয় যে তারা নায়িকা হতে চায়। এ
জন্য গ্ল্যামার নির্ভর কাজ বেছে নেন তারা। কিন্তু আপনাকে
ব্যতিক্রম মনে হয়েছে। আপনার কাজ দেখলে বোঝা যায় শিল্পী
হবার একটা চেষ্টা প্রতিনিয়তই আপনাকে তাড়া করে ফিরছে। এমনটি
কেন?
আমার মনে হয় কী, শিল্পী হতে পারাটা অনেক কঠিন কাজ। আর হলে
শিল্পীই হওয়া উচিত। তারকা বা নায়িকা-এই কনসেপ্টগুলোর সাথে
আমি বিশ্বাসী না। আমি তো থিয়েটার থেকে এসেছি। আমার
থিয়েটারের স্কুলিংটা যেরকম, সেখানে আমার মনে হয়েছে, যেকোনো
মানুষেরই একটা টার্গেট থাকতে হবে।
আর তা হতে হবে সুস্থ। শিল্পী হওয়ার চেষ্টাটা আমার এখনো আছে।
আমি মনে করি, আমার জীবনে তারকা, নায়িকা, সস্তা জনপ্রিয়তা
বা চাকচিক্যময় কিছু জিনিস থাকে না, এর দরকার নেই। আমি আসলে
নিজেকে শিল্পীর জায়গায় দেখতে চাই। সেটাই হওয়া উচিত।
শিল্পীর জায়গাটা আসলে কোথায়?
ধরুন কেউ গান শিখতে শুরু করল চার বছর বয়সে। এখন সে যদি
মনে করে সাত বছরে তার চারটি অ্যালবাম বের হলো আর সে শিল্পী
হয়ে গেল, এটা তার ভাবনার বিষয়। আবার দেড়শ নাটক করার পর কেউ
যদি মনে করে যে সে শিল্পী হয়ে গেল।
এটা আসলে যার যার দেখার ব্যাপার। আমার দেখার বিষয়টা এরকম
যে, হয়তো এমনও হতে পারে যে আমি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত শিল্পের
জায়গাটা ছুঁতে পারিনি। আমি ভাল চরিত্রে অভিনয় করতে চাই।
চরিত্রগুলোকে বিশ্বাসযোগ্যভাবে ফোঁটাতে চাই। সাধারণ মানুষ
যদি বিশ্বাস করে যে, আমি ওই চরিত্রটা, এটা আসলে শিল্পকে
একটু একটু করে ছোঁয়া।
একজন শিল্পীর জন্য জনপ্রিয়তা কি খুব জরুরি?
(একগাল হেসে) জনপ্রিয়তার কোনো দরকার নেই। কারণ আপনি
দেখেন টেলিভিশনে পর পর দশদিন আপনাকে দেখালেই সবাই আপনাকে
চিনবে। এখন তো টিভি নিউজের বদৌলতে নিউজ যারা কাভার করে,
যারা ক্যামেরা চালায়, কোনো না কোনো ভাবে তাদেরকে আমরা চিনে
ফেলেছি।
এটা তো জনপ্রিয়তা নয়। আসলে জনপ্রিয়তা, লোকজন চিনল,
পুরস্কার, নানা সুযোগ পাওয়া যায়। এটা আসলে গুরুত্বপূর্ণ নয়।
একদমই না।
তাহলে আপনার তৃপ্তির জায়গাটা কোথায়?
(দু’চোখে স্মৃতির রঙ মেখে) আমি যখন নিউ মার্কেট,
হাতিরপুল মাছের বাজারে যাই বা পলাশী বাজারে সবজি কিনতে যাই,
ঐ সময় বাজারের কোনো লোক যখন চুপিচুপি বলেন, উনি কিন্তু
রোকেয়া প্রাচী, ভাল ছবি করেন। ভাল ছবি বলতে সে যেটা
বোঝাচ্ছে, তার মধ্যে কিন্তু একটা ভালোবাসা আছে, শ্রদ্ধা আছে।
ওইটা অনেক বড় পাওয়া।
আপনি ইচ্ছে করলেই তো বাণিজ্যিক ছবিতে কাজ করতে পারতেন।
করা হয়ে ওঠেনি কেন?
অনেক বেশি না হলেও কিছু ছবিতে তো কাজ করতে পারতাম।
ইচ্ছে করলেও অনেক অন্যরকম ছবিতে কাজ করতে পারতাম না।
আমাদের এখানে আসলে সুযোগই কম। কিছু বাণিজ্যিক ছবিতে কাজ
করতে পারতাম। সেটা হয়তো আমাকে প্লাস করতো। আমি কি চাই,
কতটুকু চাই, এ বিষয়ে আমি কিয়ার। আমার গোলটা কী, আমার
ফোকাসটা কী, আমার ফিউচার, মানে আমি কাল, পরশু, কী দেখতে
চাই এটা আমার কাছে স্বচ্ছ।
কোন কোন চরিত্রের প্রতি আপনার কাজের ক্ষুধা বেশি?
আমাদের দেশের অনেক কিছুতেই পরিবর্তন আসছে। আমি চাই
আমাদের কাজ নিয়ে অনেক এক্সপেরিমেন্ট হোক। আমি নিজেও
এক্সপেরিমেন্টাল হতে চাই। ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রে কাজ করতে
চাই। আরো পরীক্ষিত হতে চাই। চাই অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি
হতে। সেটা হলে ভাল হয়।
এই যে চরিত্রগুলোর কথা বললেন, এ ধরনের চরিত্র নিয়ে কাজ
কম হওয়ার কারণ কী?
আমরা ধরেই নিয়েছি যে, মেয়েরা আমাদের মা, বোন, স্ত্রী।
শ্বশুর বাড়ি যাচ্ছে, যৌতুকের জন্য নির্যাতিত হয়ে বাবার বাড়ি
ফিরছে। এই ধরনের চিন্তার মধ্যেই আটকে আছি আমরা। এখান থেকে
বেরিয়ে আসতে হবে।
একটা মেয়ে মনে করেন গার্মেন্টেস-এর সুপারভাইজার, একটা মেয়ে
চাতাল চালায়। কয়েক মাস আগে পত্রিকায় দেখলাম নয়জন মেয়ে আছে
যারা ইয়াবা, হিরোইন ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে।
এই চরিত্রগুলো কিন্তু আমাদের নাটক বা চলচ্চিত্রে উঠে আসতে
পারে। আমরা যদি আমাদের এই সময়ের চেহারা আমাদের কাজে তুলে
না আনি, পরবর্তী প্রজন্ম কিন্তু এই সময় সম্পর্কে কিছুটা
জানবে না।
আমার মনে হয়, শরৎচন্দ্রের ত্যাগী মেয়ের চেয়ে বেশি
গুরুত্বপূর্ণ এখন যে মেয়েটি কর্পোরেট বিজনেস চালায়, প্লেন
চালায়, এ ধরনের রোল মডেলকে সামনে নিয়ে আসা।
সেটা নেগেটিভ হোক আর পজেটিভ হোক, স্ট্রং পাওয়ারটাকে সামনে
নিয়ে আসলে আমরা অনেক ভেরিয়েশন পাব, অনেক লুক পাব মেয়েদের।
আমাদের গীতিআরা সাফিয়া, রুবাবাদৌলা, এদের চরিত্রগুলো যে
কেন আসে না বুঝি না।
কিছুদিন আগে একটি কাজ করতে গিয়ে গার্মেন্ট শ্রমিক
আন্দোলনের সাথে জড়িত কয়েকজন নারীর সাথে পরিচিত হলাম। ওই
নারীরাই স্ট্রং এই অবস্থান শেষে কিন্তু বাড়িতে গিয়ে তারা
আবার মমতাময়ী মা, লাবণ্যময়ী স্ত্রী’র ভূমিকা নিচ্ছে। এই
চরিত্রগুলো আমাদের কাজে মিসিং।
|