|
বয়ঃসন্ধিকাল সম্পর্কিত প্রশ্ন
এ ব্যাপারে তোমার মায়ের সঙ্গে আলোচনা করার চেষ্টা কর। অথবা
প্রাপ্তবয়স্ক নির্ভরযোগ্য অন্য কেউ যেমন তোমার বড় বোন, দাদী, খালা,
বাবা অথবা স্বাস্থ্যসেবকের সঙ্গে কথা বল। ব্যক্তিগত ব্যাপারে
প্রশ্ন করা সব সময় সহজ হয়ে ওঠে না। তাই এ ব্যাপারে সহায়ক কিছু টিপস
দেওয়া হলো।
* মনে রেখ এটা স্বাভাবিক যে তুমি বিব্রত অথবা অস্বস্তি বোধ করবে।
* যদি দেখ যে তোমার মা খুব ব্যস্ত, শুধু এটুকু বলে রাখো, ‘একটা
ব্যাপারে আমি আলোচনা করতে চাই, যখন তোমার সময় হবে।’ কিন্তু তুমি
বেশি সময় ধরে আলোচনা বন্ধ রাখবে না।
* একবারে তোমাকে সবকিছু জানাতে হবে না। প্রথমবার একটি প্রশ্ন দিয়ে
শুরু কর।
আসলে কি ঘটছে?
এই সময়টা হচ্ছে তোমার বেড়ে ওঠার সময় আর তুমি হয়তো লক্ষ্য করবে
যে সবদিক দিয়ে তোমার দৈহিক পরিবর্তন ঘটছে। তুমি পরিবর্তন লক্ষ্য
করবে তোমার দৃষ্টিভঙ্গিতে এবং চিন্তাধারায়। আর এর কারণ হলো তুমি
এমন একটা সময় পার করছো যা হলো বয়ঃসন্ধি।
এটি একটি উত্তেজনাপূর্ণ
সময় আর এই সময় তোমার পরিবর্তন শুরু হয় ধীরে ধীরে একজন বালিকা থেকে
একজন নারী হয়ে ওঠার মাধ্যমে।
বয়ঃসন্ধি সাধারণত শুরু হয় নয় এবং চৌদ্দ বছর বয়সের মধ্যে এবং স্থায়ী
হয় কয়েক বছর। প্রত্যেকেই আলাদা এবং এটা কোনো ব্যাপার না যে কখন
তোমার শুরু হবে।
তোমার শরীরই ঠিক করবে কোন সময়টা উপযুক্ত। যে প্রশ্নগুলো তোমার মনের অজান্তে উঁকি দেয়, তার
উল্টরও তুমি পেয়ে যাবে। মনে রাখবে বিষয়টি স্বাভাবিক এবং তোমার
জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা যা সবার জীবনেই ঘটে থাকে।
ভয় পেয়ো না। কারণ পরিবর্তনগুলো কখনো রাতারাতি ঘটে না। কারও কারও
ক্ষেত্রে ঘটনাটি খুব তাড়াতাড়ি ঘটে আবার কারও কারও ক্ষেত্রে খুব
আস্তে আস্তে ঘটে।
কি ধরনের পরিবর্তন আমি প্রত্যাশা করতে পারি?
বয়ঃসন্ধিকালে মেয়েরা বিভিন্ন পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়। এর মধ্যে
গুরুত্বপূর্ণ হলো :
১. তোমার দৈহিক বৃদ্ধি ঘটে এবং তুমি আগের চেয়ে লম্বা হও।
২. তোমার দেহ প্রশস্ত হয়। বিশেষ করে তোমার কোমর প্রসারিত হয়।
৩. তোমার স্তনে প্রসারণ শুরু হয়।
৪. তোমার ত্বক আরও তৈলাক্ত হতে পারে এবং ব্রণ হতে পারে।
৫. তোমার দেহ আগের চেয়ে বেশি ঘামাতে পারে এবং তা থেকে দুর্গন্ধ
সৃষ্টি হতে পারে।
৬. তোমার দুই বাহুর নিচে, পায়ে এবং তোমার দুই পায়ের মাঝে তলপেটের
নিম্নাংশের লোমগুলো বৃদ্ধি পেতে শুরু করে।
৭. যোনিপথে স্রাবের নিঃসরণ হয়।
৮. পিরিয়ড শুরু হয়।
বেড়ে ওঠা
তোমার বয়ঃসন্ধি শুরু হয়, যখন তোমার ব্রেইনের ঠিক নিচের
পিটুইটারি গ্ল্যান্ড তোমার শরীরের জন্য ইস্ট্রোজেন নামক এক বিশেষ
ধরনের হরমোন তৈরি করা শুরু করে। ইস্ট্রোজেন মূলত ডিম্বাশয় থেকে তৈরি
হয় এবং তোমার শরীরের বেশির ভাগ পরিবর্তনগুলো ইস্ট্রোজেনের কারণেই
ঘটে থাকে।
তুমি বয়ঃসন্ধিতে পা দাও যখন তুমি লম্বা হতে শুরু কর। এ
সময় তোমার শরীরটি ধীরে ধীরে একজন নারীর শরীরে পরিণত হতে শুরু করে।
যদি দেখো তোমার বন্ধুদের পরিবর্তন তোমার তুলনায় দ্রুত হচ্ছে, ভয়
পেয়ো না। শিগগিরই তুমি ওদেরকে ধরতে পারবে।
তুমি তোমার ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলতে ভুলবে না যদি তুমি দেখো ১৪
বছর বয়সেও তুমি বয়ঃসন্ধিকালীন কোনো পরিবর্তনের মুখোমুখি হচ্ছো না
এবং যদি ১৬ বছর বয়সেও তোমার ঘটনাটি ঘটছে না, কিন্তু তোমার স্তন এবং
তলপেটের নিম্নাংশের চুল বেড়ে উঠছে।
পিরিয়ড
বয়ঃসন্ধিকালে একটা মেয়ের সম্ভবত সবচেয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে
যখন পিরিয়ড শুরু হয়। পিরিয়ড নিয়ে চিন্তার কোনো করণে নেই। এটি
প্রতিটি নারীর জীবনের খুব স্বাভাবিক একটা ঘটনা জীবনের একটি
অপরিহার্য অংশ। তোমার শরীর যে সুস্থ এবং ঠিকমতো কাজ করছে এটি তারই
প্রমাণ।
তারপরও এটি তোমার কাছে আশ্চর্যজনক হতে পারে যখন তোমার
প্রথম পিরিয়ড শুরু হয়। এটি অনেক মেয়েরই হয় আর তাই চিন্তার কোনো
কারণ নেই।
পিরিয়ড হচ্ছে যখন তোমার যোনিপথ দিয়ে কিছু তরল পদার্থ ব্লাডসহ বেরিয়ে
যায়। এটি প্রতি মাসে বেশির ভাগ নারীরই হয়ে থাকে।
অধিকাংশ মেয়েরই
পিরিয়ড শুরু হয় দশ থেকে ষোল বছর বয়সের মধ্যে। এর নির্দিষ্ট বা সঠিক
কোনো সময় নেই। তোমার পিরিয়ড শুরু হবে যখন তোমার শরীর এর জন্য
প্রস্তুত।
প্রত্যেকবার পিরিয়ড কয়েক দিন স্থায়ী হয়। স্বাভাবিকবাবে ৩-৭ দিনের
মতো থাকে।
অধিকাংশ নারীর প্রত্যেক মাসে একবার পিরিয়ড হয়। একটি পিরিয়ডের প্রথম
দিন এবং পরের পিরিয়ডের প্রথম দিন এর মধ্যবর্তী গড় সময় হলো ২৮ দিন।
কিন্তু কারও ক্ষেত্রে এটা আবার কারও ক্ষেত্রে বেশি হতে পারে। ২১
থেকে ৩৫ দিনের মধ্যে হলে এটা স্বাভাবিক।
যখন প্রথমবারের মতো তোমার পিরিয়ড শুরু হয় তখন এটা নিয়মিত নাও হতে
পারে। তোমার প্রথম পিরিয়ডের পর পরবর্তী ২ অথবা ৩ মাস পরে হতে পারে
এবং এটা ১-১০ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। তোমার শরীর একটা নিয়মিত
পিরিয়ডের জন্য কিছু সময় নেবে আর এটা ২ বছর বা তার বেশি সময়ও হতে
পারে। উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই, এটাই স্বাভাবিক। অনেক মহিলা তাদের
পরবর্তী পিরিয়ডের জন্য প্রস্তুত হয় একটি ক্যালেন্ডারে তাদের পিরিয়ড
চক্র রেকর্ড করার মাধ্যমে।
কখন তোমার পিরিয়ড শুরু হতে পারে
১. তোমার স্তন প্রসারণের দুই বছর পর।
২. তোমার তলপেটের নিম্নাংশের লোম বৃদ্ধি পাওয়ার পর পরই।
৩. তোমার যোনিপথের স্রাব নিঃসরণ
লক্ষ্য করার পরপরই।
তলপেটে ব্যথা
কিছু মেয়ে এবং মহিলা পিরিয়ডের সময় খুব কম ক্ষেত্রেই অস্বস্তি অনুভব
করে। অন্যরা পিরিয়ডের সময় তলপেটে ব্যথা অনুভব করে।
১. তলপেটে ব্যথা বা পেশি সংকোচন।
২. শরীরের পেছন দিক অস্বস্তিকর ব্যথা।
৩. উরুর ভেতরের দিকে ব্যথা।
যদি ব্যথা বেশি হয় এবং নিয়মিত সমস্যার সৃষ্টি করে তাহলে যেকোনো
ধরনের ওষুধ সেবনের আগে অবশ্যই বড়দের সঙ্গে আলোচনা করে নেবে।
চিন্তার কোনো কারণ নেই
১. পিরিয়ডের সময় ব্যথা একটি স্বাভাবিক ব্যাপার। তোমার যদি নিয়মিত
ব্যথা বা অস্বস্তি অনুভূত হয় তাহলে প্রাপ্তবয়স্ক কারও সঙ্গে কথা বলা
অথবা ডাক্তারের সাহায্য নেওয়া উচিত। যেকোনো ধরনের ওষুধ সেবনের আগে
বড়দের সঙ্গে আলোচনা করে নেবে।
২. পিরিয়ড শুরু হওযার আগে তুমি একটু
ক্লান্ত অথবা বিরক্ত হতে পারো,
কিন্তু তার পরপরই তুমি ভালো অনুভব করবে। ঘটনাটি সেই হরমোনগুলোর
জন্যই ঘটছে।
প্রি-মিনস্ট্রুয়াল সিনড্রোম
৩. প্রি-মিনস্ট্রুয়ার সিনড্রোম (পিরিয়ড পূর্বলক্ষণ) : পিরিয়ড শুরু
হওয়ার পূর্বলক্ষণ যা কোনো কোনো
মেয়ে পিরিয়ড শুরু হওয়ার ১-১৪ দিন আগে
অনুভব করে। এ লক্ষণগুলো শারীরিক বা মানসিক হতে পারে। সাধারণত মাথা
ব্যথা, মেজাজ খারাপ এবং বিষন্ন অনুভূতি হয়। একই সময়ে এসব
পরিবর্তনের উঠানামা স্বাভাবিক।
৪. কী পরিমাণ রক্ত আমি হারাচ্ছি : প্রত্যেক নারীই পিরিয়ডের সময় গড়ে
১৬-১৮ চা চামচ রক্তস্রাব হারায় কিন্তু এর মধ্যে ৭ চা চামচ হচ্ছে
রক্ত। এটা দেখে মনে হচ্ছে অনেক বেশি কিন্তু এতটা বেশিও নয় যেমন তুমি
মনে করছ।
যাই হোক তোমার শরীর ৭.৫ লিটারের বেশি রক্ত ধারণ করে আর
তাই পিরিয়ডের সময় তোমন কোনো রক্তই হারিয়ে যায় না। আর যেটুকু হারায়
সেটুকু খুব তাড়াতাড়ি পূরণ হয়ে যায়।
কেউ কি বুঝতে পারে যে কখন আমার পিরিয়ড চলছে,
ততক্ষণ না যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি কাউকে বলবে।
পিরিয়ড কেন হয়
পিরিয়ড শুধু মহিলাদেরই হয়। পিরিয়ড হচ্ছে নিয়মিত মাসিক চক্রের একটি
অংশ যা একজনের দেহের মধ্যে সংঘটিত হয়, যাতে সে বাচ্চা ধারণ করতে
পারে।
পিরিয়ডের সময় আমি কি গোসল করতে পারব?
অবশ্যই। নিজেকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য পিরিয়ডের দিনগুলো
হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ সময়।
এমন কিছু কি আছে যা পিরিয়ডের সময় আমি করতে পারব না?
না। এমন কিছু নেই। মেয়েদের জন্য পিরিয়ড হওয়াটা স্বাভাবিক এবং
স্বাস্থ্যকর। এটা তোমার স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বাধা নয়। এই অবস্থায়
তুমি স্কুলে যেতে পারবে, বাসার কাজে সাহায্য করতে পারবে এবং
বান্ধবীর বাসায় ও অন্যান্য জায়গায় বেড়াতে যেতে পারবে খেলাধুলা করতে
পারবে এবং আর সবকিছু করতে পারবে যা তুমি চাও।
কেন আমি ক্লান্ত ও অস্বস্তি অনুভব করি?
পিরিয়ডের দিনগুলোতে অনেক সময় তোমার দেহে স্বাভাবিকের চেয়ে অতিরিক্ত
পানি সঞ্চিত হয় যার ফলে তুমি কিছুটা বিরক্ত বোধ করতে পার।
বয়ঃসন্ধিকালে নিজেকে সামান্য বেমানান, খাপছাড়া মনে করা স্বাভাবিক।
তার কারণ হলো তোমার ভেতরের দৈহিক বৃদ্ধি এবং পরিবর্তন।
প্রত্যেক নারীই তার জীবনে গড়ে প্রায় ৫০০ মাসিকের সম্মুখীন হয়।
পিরিয়ড বন্ধ হয় যখন সে গর্ভবতী হয় এবং আবার শুরু হয় তার বাচ্চা
হওয়ার পর। একজন মহিলার বয়স যখন ৫০ হয়, তখন বন্ধ হয়ে যায় যাকে
মেনোপজ বলে।
পিরিয়ড বৃত্তান্ত
মহিলাদের দুটো ডিম্বাশয়ে হাজার হাজার ডিম্বানু থাকে। তোমার
বয়ঃসন্ধিকালীন সময়ে ইস্ট্রোজেনের কারনে প্রতি মাসে তোমার ডিম্বাশয়
থেকে একটি করে ডিম্বানু নিঃসরণ হয়। এই ডিম্বানু নিঃসরণের ঘটনাটিকে
ওভ্যুলিউশন বলে। তোমার পিরিয়ড শুরু হওয়ার দুই সপ্তাহ আগে ঘটনাটি ঘটে।
নিঃসরণের পর ডিম্বানুটি ফেলোপিয়ান টিউব এর মধ্য দিয়ে ইউটেরাসের দিকে
যায়। একজন পুরুষের শুক্রানু এই ডিম্বানুর সঙ্গে মিলিত হলে
ডিম্বানুটি পরিণত হয় এবং একটি শিশুর জন্ম হয়। কিন্তু বেশির ভাগ
সময়ই ডিম্বানুটি পরিণত হয় না এবং মিলিয়ে যায়।
এই সময় ইউটেরাসের
দেয়াল ভেঙে যোনিপথের ভেতর দিয়ে রক্ত হিসাবে লাল রঙের তরল পদার্থ
বেরিয়ে যায়। এই ঘটনাটিই হচ্ছে পিরিয়ড বা মাসিক।
এটি যে কোনো মেয়ে বা নারীর জীবনে একটি স্বাভাবিক ঘটনা। যা নারীর
সুস্থতা নিশ্চিত করে। তাই এই সময়ে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার মধ্যে
থাকাটা জরুরী। |