|
হেরিটেজ : খাবার ঘরে ঐতিহ্যের প্রণোদনা |
|
ইতিহাস তোমা ব্যতীত
অগ্রসর হতে পারে না। তুমি ইতিহাসের অংশমাত্র নও বরঞ্চ ইতিহাস
তোমাতেই আবর্তিত। তোমাতেই তার সমৃদ্ধি, তার বিকাশ, তার পূর্ণতা।
সে কারণে সর্বদাই ইতিহাস সংবরণে সচেষ্ট হও। কখনোই ঐতিহ্য
বিচ্যুত হও না। কেননা ইতিহাস না থাকলে ভবিষ্যত নেই। ঐতিহ্য না
থাকলে যোগ্য উত্তরসূরি নেই।
হরপ্রসাদ শাস্ত্রী
হেরিটেজ । ডিকশনারি বলছে এর বাংলা মানে হলো উত্তরাধিকার সূত্রে
পাওয়া সম্পদ। যদিও হেরিটেজ শব্দটি আরও বেশি কিছু দাবি করে।
কেননা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ঘটিবাটি, টাকা-পয়সা, জমিজিরেত
কখনো হেরিটেজ নয়। |
 |
বরং সেই সম্পদ যার সঙ্গে
যোগ আছে ঐতিহ্যের, কালোত্তীর্ণ গর্বের, সংস্কৃতির ধারাবহনকারী
কনসেপ্টের। বাঙালির ঐতিহ্য নেই এই ভাবনা ভুল। বরং অনেক জাতির
তুলনায় খানিকটা বেশিই আছে। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া প্রকৃতি,
বনভূমি, পুরোকীর্তি প্রভৃতিজাতি হিসেবে আমাদের শ্লাঘাবোধে আরও
খানিকটা ইন্ধন যোগায়।
একটা পুরোদস্তুর আয়েশি খাবার ঘর, তার নাম হেরিটিজ। প্রথমে খানিকটা
দ্বন্দ্বেই পড়ে গিয়েছিলাম। কোনটা ঐতিহ্যবাহী খাবার, পরিবেশন কৌশল,
নাকি অন্দরসজ্জা? ক্রমশ সে দ্বন্দ্ব কেটেছে এবং ঐতিহ্যের সপ্রাণ রসে
জারিত হয়েছি। |
|
 |
|
দেখতে দেখতেই বেশ কটি বছর
পার করে এসেছে রেস্তোরাঁটি। সামনের মাসেই চার বছর পেরোবে।
প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ২০০৪-এ। একটি রেস্তোরাঁর যেটি প্রাণভোমরা
অর্থাৎ খাবার, তার স্বাদ ও মান অবিকল আছে প্রথমদিনের মতোই।
বরং বেড়েছে পদের সংখ্যা, পরিবেশন দক্ষতা ও সেবার মান। হবে নাই
বা কেন? এর পেছনে যে আছে ভূবনবিখ্যাত প্রবাসী বাঙালিলোক টমি
মিয়া। তবে শুধু টমি মিয়ার নামের ভারে নয়, হেরিটিজ দাগ কাটছে
তার প্রসাদগুণেও।
গুলশান-১ ও ২-এর মাঝামাঝি ১০৯ ও ১১০ নং রোডের ঠিক সঙ্গমস্থলেই
হেরিটেজ। খুঁজে পেতে তেমন ঝক্কি পোহাতে হবে না।
|
|
|
|
কেননা
গুলশান ইয়ুথ কাব মাঠের বিপরীতে দাঁড়ানো বাড়িটির টেরাকোটা তোরণটিই
সগৌরবে জানান দিচ্ছে হেরিটেজের উপস্থিতি। কাঠের মোটা নিরেট
তোরণদ্বারই আপনাকে ইতিহাসের পথ ধরে হাঁটতে প্রণোদনা দেবে। ডানে
প্রশস্ত লন। যেকোনো আউটসাইড পার্টির জন্য মোম।
সোজা হেঁটে অভ্যর্থনায় ঢুকতে পেরুতে হবে আরও একটা সিংহ দরজা।
আনন্দবোধ হবে রিসেপশন টেবিলটা দেখে। ওটি এখন টেবল হলেও ছিল মূলত
সিন্দুক। তাও পেল্লাই সাইজ ও ওজনের। রেস্তোরাঁর মূল ফোকাস তার থিমে।
এমনিতেই ঢাকা শহরে থিম বেইজ রেস্টুরেন্টের সংখ্যা গুটিকয়। তার মধ্যে
আবার দু-একটিতে থিম বোঝার জন্য ম্যানেজারের সাহায্য চাইতে হয়;
তারপরও বুঝে উঠতে বেগ পেতে হয়।
কিন্তু এখানে সেসবের বালাই নেই। অভ্যর্থনা থেকে ডানদিকের ঘরে
ঢুকতেই পঞ্চম শতকের পাহাড়পুর। ইউনেস্কো কর্তৃক ওয়ার্ল্ড হেরিটিজ
ঘোষিত পাহাড়পুরের স্মৃতি জড়ানো এই ডাইনিং হলটিতে পুরো অন্দরসজ্জা
জুড়েই খোলা ইটের প্রাধান্য। একপাশে খোলা ও একপাশের কাঁচের দেয়াল
ঘরটির প্রশস্ত বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ।
মেঝের সাদা-কালো মার্বেল অবশ্য স্মরণ করিয়ে দেবে বাবু কালচারের
রোশনাই। মাথার ওপর নকশি কাঁথার চন্দ্রাতপ। এই হলের চেয়ার-টেবিলগুলো
ঋজু, মেদহীন, স্লিম ডাইনিংয়ের পক্ষে আদর্শ। এ রকম রয়েছে আরও পাঁচটি
খাবার ঘর। প্রতিটিই আপনাকে খানিকটা ঐতিহ্যমুখী করে তুলবে। পাহাড়পুর
পেরিয়েই সুন্দরবন। আলো-ছায়াময় অন্দরসাজে ম্যানগ্রোভের আবহ। |
|
সোজা
তাকালেই দেখবেন জ্যান্ত গুটিকয় হরিণ চরে বেড়াচ্ছে। নিচের
তলাতেই রয়েছে আরও দুটি খাবার ঘর। একটি মহান্থানগড়। বৌদ্ধযুগের
স্মৃতি মনে করিয়ে দিতেই যেন এখানকার বসার আসনগুরো খানিকটা নিচু।
বেশ একটা আয়েশি ভাব। অন্যটি এক্সকুসিভ প্রাইভেট রুম, ময়নামতি।
খুব বড় নয়। তাই একান্ত পরিবার পরিজন নিয়ে সময় কাটানোর পক্ষে
আদর্শ।
এবারে সিঁড়ি দিয়ে উঠে যান দোতলায়। উঠতে উঠতেই খেয়াল করবেন যে,
সিঁড়িটা আপনাকে খানিকটা নস্টালজিক করে তুলছে। |
 |
|
|
কাঠ ও ঢাই লোহার অর্নামেন্টাল রেলিং সিঁড়ির টাইলস সাবেকী ঘরানার,
উনিশ শতকীয়।
মাথার উপরে ঝাড়বাতিটিও আপনাকে একই মেসেজ পৌঁছে দেবে। দোতলায় উঠতেই
বাঁয়ে এক প্রশস্ত খোলা চত্বর। এটি লালবাগ কেল্লা। রাতের বেলা আধো
অন্ধকারে ক্যান্ডেলের মায়াবি আলোতে যখন আপনার চোখ হারিয়ে যাবে
সঙ্গিনীর চোখে, মুখের মধ্যে মাখনের মতো গলে যাবে আহসান-এ লাজিজ
কবাব। সে বোধ করি এক জবরদস্ত অনুভব। এর পরে আরও দুটি ডাইনিং হল
আহসান মঞ্জিল ও বুড়িগঙ্গা। বুড়িগঙ্গার দেয়ালজোড়া এক পেইন্টিং ও
আলোর চুতুর ব্যবহার আপনাকে খানিকটা নৌবিহারের আমেজ দেবে।
বসতে পারেন যেকোনো জায়গায়। আপনার কিংবা ভোজনসঙ্গী দলের ইচ্ছেমতো
বাছাই করতে পারেন আ লা কার্তে অর্থাৎ পছন্দসই পদ অথবা বুফে থেকে।
তবে আমায় যদি বলেন, আমিও দিতে পারি খানিকটা সাজেশন। যেমন স্টার্টার
হিসেবে সুন্দরবন চিংড়ি রোটি। মেথি, পেঁয়াজ, লেবুর রসে জমজমা
মসলাদার চিংড়ি রুটি। অথবা আমচুড়, কাঁচা মরিচ ও টকদই সহযোগে গ্রিল
করা মুরগির টক-ঝাল-মিষ্টি পদ খাট্টা মিঠা টিক্কা। আর যদি হন ভেজ তবে
অবশ্যই তন্দুর ব্রকলি। দই, রসুন আদার মাঝারি সঙ্গেমে মধুর ফুলকপির
রোস্ট।
যদি মৎসাহারী হন তো অবশ্যই জিভ ডোবান হেরিটেজের চিংড়ি সমুদ্রে।
কারণ ঢাকার বোধহয় আর কোনো রেস্তোরাঁয় চিংড়ি দিয়ে এতগুলো পদ হয় না।
উত্তর ভারতীয়, গোয়ানিজ, দক্ষিণ ভারতীয়, পেরিপেরি, বঙ্গদেশের
উপকূলীয় ইত্যাদি নানান স্বাদের মধ্যে সওয়ার হয়ে যান যেকোনো একটি
প্রন জার্নিতে। নিশ্চিত গ্যারান্টি ঠকবেন না।
চিংড়ির বাইরে মীনকুলেও আছে হেরিটেজের বৈচিত্র্য। মিঠে পানি হতে লোনা
জল বাদ পড়েনি কোনো কূলেরই মছিল। আর যদি হতে চান সিংহ মামা তবে
রাজার মতোই পাতে নিন মুর্গ মহারাজ। পঞ্জাব ও মোগল ঘরানার এক জিভে
জল আনা ধ্রুপদী কম্বিনেশন। আমত্ত, পেস্তা, খোয়ারি, টমেটো ও কাজুর
স্বপ্নে বিভোর তুলতুলে সোনালি মুরগি। যদি ঝোল ঝাল সুরুরায় আপত্তি
থাকে তবে পাতে পাড়ুন শুকনো ছিমছাম লোরিয়েন্ট স্পেশাল চিকেন। দই,
টমেটো, নারকেল ও আমন্ড পেস্টের সাথে ডাইসড চিকেন। |
|
 |
রাজা
মহারাজা আমির ওমরাহর পদাঙ্ক অনুসরণের পর একবার ফিরে আসুন মাটির
টানে। চেয়ে ফেলুন চাঁটগাইয়া মেজবান গোশত। সিম্পলি লা জবাব।
নিরামিষ্যি হলেও আপনার চিন্তার কিছু নেই। কেননা এক আলুর দম
কাশ্মিরী কিংবা নিরামিষ নবরত্ন ভোগ অর্থাৎ নওরতন ভোজেই তো
রসনায় আদিগন্ত বাসনা মেটাতে বিলকুল সম।
তবে মধুরেণ সমাপয়েৎ ঘটাতে শেষ পাতে শাহী মেজাজে মুখে ফেলুন শাহী
টুকরা। গাওয়া ঘি, ঘন ক্ষীর আর বাদাম পেস্তা কিসমিসের হাতছানি
দেয়া পেলব মিষ্টান্ন। প্রথম কৈশোরে খাওয়া চুমুর মতোই স্বাদ লেগে
থাকবে দীর্ঘক্ষণ। গ্যারান্টি নিষ্প্রয়োজন।
লেখা এবং ছবি: ক্যানভাস |
|
|
ইনডিভিজুয়ালিটির
একান্ত বৈভব
রেডিসনে
|
|
এমন কি যেতে চায় ভূমধ্যসাগরের কোনো দ্বীপে? জলঘেরা
শ্যামলিমার শুধু দ্বীপসুলভ নীরবতাই নয়, ছবির মতো ছড়িয়ে
থাকবে ভালো লাগার হাতছানি। টুকরো টুকরো মুগ্ধতা।
অবশ্য এ দ্বীপে তাকতে চাইলে রাত্রিবাসের জন্য খুঁজতে হবে
না সবুজের মাঝে কোনো নিরাপদ আশ্রয়। জলের পাশেই
রাত্রিবাসের রাজসিক আয়োজন।
যেখানে শুয়ে বসেই উপভোগ করতে পারবেন নীল স্বচ্ছ জলে ঘেরা
ইনডিভিজুয়ালিটির একান্ত বৈভব। তবে রহস্য থেকেও এ দ্বীপে
রোমাঞ্চ বেশি। বেশি রোমান্টিক হয়ে ওঠার প্রলোভন।
|
|
 |
|
|
 |
সেই
লোভের ফাঁদে পা দিতেই চলে যান না জল ছোয়া এক নতুন। সেজন্য
অবশ্য ভূমধ্যসাগরে যেতে হবে না। প্রয়োজন নেই পাসপোর্ট ডলার ভিসা।
শুধু যেতে হবে এয়ারপোর্ট সংলগ্ন ক্যান্টনমেন্ট এরিয়ায়।
যেখানে সন্ধ্যে রাতে প্রায় ভাসমান কফি শপের কাছে পান্না
সবুজ-নীলাভ জলে পা ডুবিয়ে বসে থাকা। পাশে কোমল পানীয়ের গ্লাস।
নগর ঢাকার মরুময় আবহ ছেড়ে চিনে নিন শীতলতার আমেজ। এই শহর
মরুভূমির মধ্যেই গড়ে উঠেছে এক মরুদ্যান। হোটেল রেডিসন
বাংলাদেশের তৃতীয় পাঁচতারকা অভিজ্ঞতা। |
|
|
রেডিসন একটি ইন্টারন্যাশনাল চেইন হোটেল। বিশ্বের ৫১টিরও বেশি দেশে
রেডিসন রয়েছে। বাংলাদেশে রেডিসন ওয়াটার গার্ডেন হোটেল, ঢাকা শুরু
হয়েছে ১১ ফেব্রয়ারি ২০০৬-এ। রেডিসনকে ওয়াটার গার্ডেন বলা হয় এর
কারণটা হচ্ছে হোটেলের পেছনটা জুড়ে আপনি অসংখ্য ওয়াটার ফিচার দেখতে
পাবেন। সবকিছুতেই ওয়াটার ফিচারটাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
আকর্ষণীয় লোকেশন এয়ারপোর্ট রোডে অবস্থিত রেডিসন ওয়াটার গার্ডেন
হোটেল। জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে মাত্র ৫ কিলোমিটার দূরে।
গুলশান, বারিধারা এবং বনানীর মতো ডিপ্লোমেটিক জোন রেডিসনকে করে
তুলেছে, অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য। ওয়াটার গার্ডেন নামটিকে সার্থকতা
দেওয়ার জন্য ৭.৫ একর জমি জুড়ে অবস্থিত রেডিসনের চারপাশের ওয়াটার
ফিচার মুগ্ধ করবে যে কাউকে। হোটেলের চেয়ে বরং রিসোর্ট মনে হতে পারে
এটিকে যা রেডিসনের আরেকটি ইতিবাচক দিক।
রেডিসনের যত সুবিধা
* ৫টি বিলাসবহুল স্যুইঁটসহ মোট রুম ২০৬টি
* সব রুমে রয়েছে দ্রুতসতির ইন্টারনেট সংযোগ, মিনিবার, চা/কফি বানানো
সুবিধা, ল্যাপটপ কানেকশন।
* রেডিসন ক্লাব ফোর।
* পাবলিক এরিয়াতেও ওয়ারলেস ইন্টারনেট সংযোগ সুবিধা।
* ২৪ ঘন্টা অভ্যর্থনা এবং রুম সার্ভিস।
* ৩টি রেস্টুরেন্ট, ২টি লাউঞ্জবার, ১টি ক্যাফে।
* আন্তর্জাতিক মানের স্পা (৮টি ট্রিটমেন্ট রুমসহ) এবং হেলথ কাব।
* সুইমিং পুল, টেনিস কোর্ট, গলফ কোর্স, জগিং ট্র্যাক।
* বোর্ড রুম এবং সেক্রেটারিয়াল সার্ভিসসহ বিজনেস সেন্টার।
* দেশের সর্ববৃহৎ মিটিং, ফাংশন এবং কনফারেন্স সুবিধা।
* ভেতরে এবং বাইরে কার পার্কিং সুবিধা।
* নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা, সার্বণিক সিসি টিভি।
ডাইনিং
* ওয়াটার গার্ডেন ব্র্যাজারি।
* সাবলাইম রেস্টুরেন্ট।
* স্পাইস অ্যান্ড রাইস এশিয়ান রেস্টুরেন্ট।
* কিট চ্যাট ফিটনেস সেন্টার।
* ব্লেজ এন্টারটেননমেন্ট জোন।
* সিগার বার।
মিটিং অ্যান্ড ব্যাঙ্কোয়েটস
* হোটেলের ৩০ হাজার স্কয়ার ফুট জায়গা জুড়ে মিটিং সুবিধা।
* গ্র্যান্ড বলরুম : ৯,৯০০ স্কয়ার ফুট জায়গা নিয়ে গ্র্যান্ড বলরুমটি
ঢাকার সবচেয়ে বড় বলরুম। একসঙ্গে ১১০০ অতিথি ধারণ মতাসম্পন্ন।
* ব্যাঙ্কোয়েট হল : থিয়েটার স্টাইলে এ ব্যাঙ্কোয়েট হলে একসঙ্গে ৮৫০
জন অতিথি বসতে পারেন অনায়াসে।
লেখা এবং ছবি: ক্যানভাস
|
|
কোন
অঞ্চলের চরিত্র প্রকাশ পায় তার রেস্তোরাঁর মেন্যুবুকে কথাটা
বলেছেন খোদ গ্যারি ডাম্পেলটন, রসনা সাংবাদিকতায় যার জগতজোড়া
নাম। যেমন লন্ডনের পাব কিংবা রাস্তার দোকানগুলোতে কফির আগে
হালকা খাবার বলতে বেকনের সাথে নরম বার্গোত্তিলা রুটি। খেতে
সময় লাগে না।
ঝটপট খেয়েদেয়ে, কফিটা কোনমতে গিলে কাজে দৌড়! পাশের লোকটির সাথে
আলাপ বলতে বড়জোর ভুরুজোড়া নাচিয়ে টুকরো মত্মব্য আজ বরফ পড়বে
মনে হচ্ছে বা ঠাণ্ডা কমে যাচ্ছে, সামারের আর দেরি নেই।
|
|
 |
অথচ ইংলিশ
চ্যানেল পাড়ি দিয়ে প্যারিসে পৌঁছলেই চিত্রটা একদম বদলে যাবে। রাস্তার
ধারের ক্যাফেগুলোতে কফির সাথে সেখানে চলে লম্বা খাস্তা গোরতো টোস্ট।
চিবিয়ে খেতেও সময় লাগে। আর গরম কফি নাকি ফরাসীরা একদমই খেতে পারে না।
তাই জুড়িয়ে খায়। সাথে চলে প্রলম্বিত আড্ডা।
সেখানে বিষয় হিসেবে টমেটোর দাম হতে শুরু করে ইরাক পরিস্খিতি কিংবা জ্যঁ
পল সার্ত্র হতে নোয়াম চমস্কি- কিছুই বাদ পড়ে না। যা হোক, মোদ্দাকথাটা
হলো- রেস্তোরাঁর চরিত্র যে কোন অঞ্চলের মানুষের জীবনধারাকেও
রিপ্রেজেন্ট করে। খাদ্যাভ্যাস, এমনকি রেস্তোরাঁর অন্দরসজ্জাও বলে দেয়
এর খদ্দেররা অলস নাকি কর্মঠ, আড্ডাবাজ নাকি গোমড়ামুখো, কমবয়সী নাকি
আন্টি টাইপ। এই ফুডকোর্টের কথাই ধরুন না, ওই যে সাত মসজিদ রোডে
ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটির পাশেই তো।
কড়াই গোশতের লাগোয়া সামনে অবশ্য মেক্সিকানা চিকসের মোটা লালমরিচওয়ালা
লোগোও আছে, ওটার কথাই বলছি। আচ্ছা, বলুন তো ওই অঞ্চলটাতে কারা থাকে?
জেনুইন মধ্যবিত্ত থেকে উচ্চ মধ্যবিত্ত, ঠিক তো? আর আশপাশে অনেকগুলো
প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি। সেগুলোর দখলও কিন্তু ওই মধ্যবিত্ত পরিবারের হাতে।
ফলে এরাই ফুডকোর্টের বেসিক খদ্দের। আর এদের কথা মাথায় রেখেই করা হয়েছে
ফুডকোর্টের অন্দরসজ্জা ও দাম। তার মানে এই নয় যে, বিষয়টা সম্পূর্ণ
বারোয়ারী। বরং একটা নির্দিষ্ট গ্যাদারিংকে টার্গেট করে তাদের তাবত
প্রাপ্তি ও স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করা হয়েছে এই রেস্তোরাঁয়।
|
 |
কাঁচের দরজা
ঠেলে ঢুকলেই একসার টেবিল, কাঠের এবং নিচু জাপানি ঘরানায় তৈরি।
প্রতিটি টেবিলের কেন্দ্রে সুতোর মতো তার বেয়ে নেমে এসেছে কাঠের
ফেন্সমে বাহারী আলো, উপরে সাদা সিল্কের রুফটপ। ডানে বেশ একটা
চারকোনা সেন্টার টেবিলের চারধারে আড্ডা মারার প্রশস্ত জায়গা।
ফুডকোর্টের ডেকরের মূল মজাটা অন্যত্র। কাঠের প্যানেলে ঘেরা ছোট ছোট
আলাদা কুঠুরি। কোনটা ফ্যামিলি টেবিল। ছজন কিংবা আটজনের, কোথাও বা
ইনডিভিজুয়ালিটির চমক দিতে দুজনার স্পেস।
|
লুকোচুরির পক্ষে
যাকে বলে আদর্শ। ৩৬০০ স্কয়ার ফিটের চতুর বিন্যাস। ফলে সহজেই এক কোণে
চুপচাপ হারিয়ে যেতে মোটেও বাধা নেই। ফুডকোর্টের মূল ম্যাজিক তার
ফুডজার্নিতে। আছে থাই রসে ডুব দেবার আহ্বান। স্যুপ, স্টার্টার, মেইন
কোর্সের নাগাল পাওয়া দামে সুষম আয়োজন। মেক্সিকান বা পেরিপেরি চিকেনের
ঝাঁঝে কিংবা ঝালে কান গরম করতেও বাধা নেই। তবে আসল মাস্তানিটা দমপোখত
স্টাইলের রইসি মেজাজে অর্থাৎ বিরিয়ানিতে। কারণ এখানকার বিরিয়ানি
স্বাদে-গন্ধে এই শহরের চালু ঘরানা অর্থাৎ পুরনো ঢাকা স্টাইলের আমূল
বিপ্রতীপ।
খানদানী বিরিয়ানির মূলত তিনটি ঘরানা। লাক্ষ্মৌয়ি, হায়দ্রাবাদী ও বোখারী।
কিন্তু গত তিন দশকের প্রচেষ্টায় বিশ্ববিরিয়ানি মানচিত্রে ঢাকার নামটিও
অনিবার্য হয়ে উঠেছে ক্রমশ। এর রসালো নরম ঢিমা আঁচের কাচ্চি স্টাইল ও
অনুপান হিসেবে নিখাদ ঢাকাইয়া বোরহানি এক নতুন ঘরানার জন্ম দিয়েছে।
কিন্তু ফুডকোর্টের বিশেষত্ব তার হায়দ্রাবাদী ভারি রান্নার গুণে, রসালো
অথচ ছিমছাম শুকনো মাংসের ভাপা আমেজে।
গত মাসেই ফুডকোর্টে হয়ে গেল ৭ দিনব্যাপী হায়দ্রাবাদী বিরিয়ানি উৎসব।
খোদ হায়দ্রাবাদ থেকে এসেছিলেন শেফ শ্রীনিবাসন। ঢাকাবাসীকে খাইয়ে গেলেন
ঢিমা আঁচে দমপোখতে ফুরফুরে চার ধরনের বিরিয়ানি। মাটন দম বিরিয়ানি,
চিকেন দম বিরিয়ানি, চিংড়ি দম বিরিয়ানি ও মছলি দম বিরিয়ানি।
এ মাসেই আসছেন আবার, মাসের মাঝ বরাবর। এবারে থাকছে আরো দুটো হায়দ্রাবাদী
সিগনেচার বিরিয়ানি, বিশেষত হায়দ্রাবাদী মোতি বিরিয়ানি অর্থাৎ মাংসের
কিমা দিয়ে বানানো গোল বল বা মোতি দিয়ে বিরিয়ানি, যেটি একবারেই
হায়দ্রাবাদের নিজামের রসুইঘরের খাস আবিষ্কার। এবং দক্ষিণ ভারতীয় সবজি
পোলাও।
হায়দ্রাবাদী বিরিয়ানির দুটো উপাদানগত বৈশিষ্ট্য আছে। এক. বাসমতি চাল,
দুই. খাঁটি মহিষা ঘি (অবশ্যই গরুর নয়)। বাসমতি চাল, মোটাদানার মহিষের
ঘি ও খাঁটি জাফরান মিলে যে জমাটি গন্ধটা ছড়ায় সেটাই হায়দ্রাবাদী
বিরিয়ানির আসল কারিশমা।
ফুডকোর্টের তরুণ অংশীদার রাজ ডাটলা তাদের খাবারে এই তিনটি বিষয়েরই ১০০
ভাগ পিওরিটি নিশ্চিত করেছেন। আর সেই তুলনায় দামটা যে রিজনেবল তা এই
প্রতিবেদকই নিশ্চিত করছে। ফলে একবার অন্তত খাঁটি হায়দ্রাবাদী বিরিয়ানিতে
কব্জি ডুবিয়ে মনে মনে নিজেকে নিজাম ভাবতে দোষ কোথায়?
লেখা এবং ছবি: ক্যানভাস
|