|
বিটিভির শুরু থেকেই কাজ করছেন। সময়ের
বিবর্তনে নির্মাতাদেরও প্রজন্মের বদল হয়েছে। শুরু থেকে আজকের নির্মাতাদের সঙ্গে
কাজের অভিজ্ঞতা কি রকম?
বিটিভিতে আতিকুল হক চৌধুরী, আব্দুল্লাহ আল মামুন, মোস্তাফিজুর রহমান, মোহাম্মদ
বরকত উল্লাহ, নওয়াজীশ আলী খান, মোস্তফা কামাল সৈয়দ, তাদের সঙ্গে কাজ করেছি। তারা
প্রত্যেকেই যতেষ্ট অভিজ্ঞতা সম্পন্ন মানুষ। তারা সময়ে নিয়ে ধরে ধরে সুন্দরভাবে
কাজ করতেন। টিভি নাটকে হাতেখড়িটা কিন্তু তাদের কাছ থেকেই।
কিভাবে ক্যামেরার সামনে অভিনয় করতে হয়। ভাল কাজ করতে হলে কি করতে হবে, খুঁটিনাটি
অনেক বিষয়ই তাদের কাছ থেকে শিখেছি। তারপর প্রজন্মের বদল হয়েছে। সবাইকে দেখেছি
ভাল কাজের প্রতি আন্তরিক থাকতে। এখন নতুন ছেলে মেয়েরা যারা কাজ করছেন। এরাও
সুন্দর কাজ করে।
এখন তো নতুন প্রজন্ম ঘরে বসেই সারা পৃথিবীর কাজ দেখে নিজেদের সমৃদ্ধ করতে পারছে
সহজেই। তখন এ সুযোগ ছিল না। এখন কারিগরি সুবিধা অনেক। নতুনরা ইচ্ছে করলেই ভাল
কাজ করতে পারছে। অনেকে আবার তা পারছে না।
নতুন প্রজন্মের কার কার সঙ্গে কাজ করে আপনার ভাল লেগেছে?
তৌকির আহমেদের সঙ্গে কাজ করে আমার ভাল লেগেছে। আমার মনে হয়েছে অভিনেতা তৌকিরের
চেয়ে পরিচালক তৌকির বেশি সমৃদ্ধ। ও প্রচুর পড়াশোনা করে। অভিনয়, ক্যামেরা, মেকিং
অনেক ভাল বোঝে সে। অমিতাভ রেজার সঙ্গে যদিও আমার বেশি কাজ করা হয়নি। তারপরও বলব
ও ভাল কাজ করে।
বন্ধন প্রথম দিকে আমি ওর সঙ্গে কাজ করেছি। ভাল লেগেছে অমিতাভের কাজের ধারা।
গিয়াসউদ্দিন সেলিমও দারুণ কাজ করে। আফসানা মিমির সঙ্গে কাজ করেও আনন্দ পেয়েছি।
এছাড়া নতুন অনেকের সঙ্গে আমার কাজ করা হয়নি। কিন্তু তাদের কাজ দেখে ভাল লেগেছে।
এর মধ্যে রয়েছে নূরুল আলম আতিক, অনিমেষ আইচ।
নারী ও পুরুষ দুই ঘরানার নির্মাতাদের সঙ্গেই আপনার কাজ করা হয়েছে। তাদের
সঙ্গে কাজের কোনো পার্থক্য চোখে পড়েছে কি? বা আন্তরিকতার দিক থেকে তাদের কেমন
দেখলেন?
উদাহরণ স্বরূপ আমি চয়নিকা চৌধুরীর কথাই বলি, আমি এখন ওর সঙ্গে কাজ করছি।
প্রত্যেক বিষয়েই ওর সজাগ দৃষ্টি। অভিনয় ঠিক হচ্ছে কিনা তা মনিটরে দেখছে, লাইট
ঠিকঠাক আছে কিনা, টেবিল কথ ঠিক কিনা, সব কিছু নিখুঁত চায় সে। এমনটি আফসানা মিমি
ও তারানা হালিম-এর বেলায়ও আমি তা দেখেছি। পুরুষদের তুলনায় নিখুঁত সেটের বিষয়টি
মেয়েরাই বেশি ভাবে। এরমধ্যে আবার আবুল হায়াতসহ কয়েকজন এ বিষয়েও খেয়াল রাখেন।
এক ঘন্টার নাটকেই অভিনয়শিল্পীরা বেশি তৃপ্ত হন বলে শোনা যায়। আপনিও কি সে
রকম। ডেইলিসোপকে অনেকে নেতিবাচকভাবে দেখেন। আপনার ভাবনা কি?
এক ঘন্টার নাটকে কাজ করে আমিও বেশি আনন্দ পাই। কারণ, এতে আমি পুরো ঘটনা ও
চরিত্রটাকে তুলে ধরতে পারি। এক সিটিংয়ে পুরোটা দেখার একটা আলাদা আনন্দ আছে।
আমার চরিত্রটা আমি সম্পূর্ণ করতে পারি। সিরিয়াল করলে দেখা যায় পুরো কাজ আমি
দেখাতে পারি না।
ছিড়ে ছিড়ে এ মাসে দুইদিন তার পরের মাসে তিনদিন এভাবে কাজ করতে হয়। ফলে এক
ঘন্টার মতো টানা কাজের আনন্দ থাকে না। আর ডেইলিসাপের বিষয়টি আমি পজেটিভলিই দেখি।
এটা আমরা প্রফেশন হিসেবে নিয়েছি। শিল্পের পাশাপাশি আমাদের বাণিজ্যের বিষয়টি
নিয়েও ভাবতে হবে। বড় বড় সিরিয়াল হচ্ছে বলেই আমরা শিল্পীরা অভিনয়কে প্রফেশন
হিসেবে নিতে পেরেছি। এটা একটা বিরাট ব্যাপার।
নাটক যদি আমরা প্রফেশন হিসেবে নিতে না পারতাম তাহলে আমাদের অনেকে বেকার হয়ে
যেতেন। অনেক প্রতিভা নষ্ট হয়ে যেত। তবে শুধু বাণিজ্যের চিন্তা করে যেমন কাজ করা
উচিত নয়, তেমনি শুধু শিল্পের কথা ভাবলেও বলবে না। এখানে বাণিজ্য ও শিল্পের
সমন্বয় থাকতে হবে। একদিন ত্রিশ সিকোয়েন্স নামাতে হবে- এমন না ভেবে একটু সময় নিয়ে
কাজ করলে সিরিয়ালও ভাল হয়। মানুষ দেখেন।
এই যে কয়েক যুগ ধরে অভিনয় সংসারে সময় যাপন, কখনো কি এ মাধ্যম ছেড়ে নির্বাসনে
যেতে মন চায়নি?
না, এমনটি আমার কখনো মনে হয়নি। আর তা এ জন্য যে, চার বছর বয়স থেকেই আমি অভিনয়
করছি। এটা আমার জীবনের সঙ্গে মিশে গেছে। আমি এ কাজে এমন অভ্যস্থ হয়ে পড়েছি যে
এখন অভিনয় ছাড়া একটি দিন কাটাতে আমার কষ্ট হয়। তাই নির্বাসনের কথা আমি ভাবতেই
পারি না। আর পারবও না কখনো।
এক সময় নাটকের আগে রিহার্সেলের প্রথা চালু ছিল। এখন কি সে সুযোগ হয়?
রিহার্সেল আগে হতো। আর এ কাজ করে যদি অভিনয় শুরু করা যায় তাহলে নাটকের মান ও
অভিনয় দুটোই ভাল হয়। রিহার্সেলের সময় সংলাপ, গেটআপ, ড্রেস কিভাবে পরবো, এ রকম
বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়। আগে আমরা কাজের আগে তিন-চারদিন এসব নিয়ে আলোচনা করে
কাজ শুরু করতাম।
এখন যে আমরা রিহার্সেল করি না এমনটি বলা যাবে না। হয়তো আগের মতো তিন-চারদিন
একসঙ্গে বসে রিহার্সেল করা হয় না। কিন্তু আমরা স্ক্রিপ্ট পাওয়ার পর পুরো
স্ক্রিপ্টটা মনোযোগ দিয়ে পড়ি। চরিত্রটি বোঝার চেষ্টা করি। গেটআপ নিয়ে প্রথমে
নিজে ভাবি। তারপর টেলিফোনে পরিচালকের সঙ্গে আলাপ করে আমরা একটি সিদ্ধান্ত নেই।
যেমন আমি এখন চয়নিকা চৌধুরীর প্রথম ধারাবাহিক ‘বৈশাখ থেকে শ্রাবণ’- এ কাজ করছি।
এতে আমার চরিত্র নিয়ে আমি ভেবেছি এরকম যে, আমি একটি চশমা পরব, লাঠি নেব, চুল
সাদা করব, সাদার উপর বেইজড করে শাড়ি পরব। পরিচালক বললেন, আমিও এমনটিই ভেবেছি।
তবে চশমার সঙ্গে একটা চেইন লাগিয়ে নিও। এভাবে কিন্তু আমাদের একটি রিহার্সেল হয়ে
যায়।
প্রস্তুতি ছাড়া আমি কখনো সেটে আসিনি। এছাড়াও আমরা শিল্পীরা প্রত্যেকটি দৃশ্যে
ধারণের আগে মেকআপ রুমে বসে পরিচালককে সঙ্গে নিয়ে পরামর্শ করে তারপর ক্যামেরার
সামনে যাই। আগে প্রচুর সময় ছিল আমাদের। একটি চ্যানেল ছিল বলে অনেক সময় দিতাম
রিহার্সেলে। এখন চ্যানেল বেড়ে যাওয়ায় আগের মতো সময় ব্যয় করতে পারি না রিহার্সেলে।
নির্মাতাদের অনেকেই বলেন, আগের মতো রিহার্সেল হয় না বলে নাটকের মান এখন
কিছুটা নেমে গেছে। আপনিও কি তাদের দলে?
আমি সেই দলে নই। আগে কাজ কম হতো বা সময় নিয়ে কাজ করা যেত বলে যে সব নাটকই তখন
ভাল হতো তা বলাটা বোধ হয় ঠিক হবে না। সে সময় ভাল স্ক্রিপ্ট, পরিচালক,
অভিনয়শিল্পীর সমন্বয় হতো যে নাটকে কেবল সেই নাটকটিই ভাল হতো। আর এ সমন্বয়ে
কোনোটার অভাব থাকতো যে নাটকে তা কিন্তু ভাল হতো না।
এখন অনেক নাটক হয়। এর মধ্যে সবগুলোই যে ভাল হয় তা নয়। মানহীন নাটকও হচ্ছে এখন।
একজন মেধাসম্পন্ন পরিচালক চাইলেও একট মানহীন নাটক বানাতে পারবে না। কারণ তার
নিজস্ব একটি রুচি ও ইমেজ রয়েছে। নিশ্চয়ই সে চাইবে না তার অর্জিত সুনাম নষ্ট হোক।
তবে নাটক বানালেই পয়সা পাওয়া যায়, চলো নাটক বানিয়ে ফেলি-এমন মনোভাব নিয়ে যে
নির্মাতারা কাজ করেন, তাদের কাজ তো মানহীন হবেই। ভাল মন্দের মিশ্রণটা সব সময়ই
ছিল; এখনো আছে।
আপনার মতো একজন অভিনয়শিল্পী এখনো যখন কাজের আগে রিহার্সেলের কথা ভাবেন। তখন
এ প্রজন্মের কয়েকজন শিল্পীদের কাছে নাটক সম্পর্কে জানতে চাইলে বলেন, ভাই এখনো
স্ক্রিপ্ট পাইনি। সেটে গেলে বুঝতে পারবো। বিষয়টি নিয়ে আপনার ভাবনা কেমন?
আমি আমার কথাই বলি। আমি একটি নাটকে কাজের কমপক্ষে সাত দিন আগে স্ক্রিপ্ট পাই।
কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারও অনেক আগে পাই। তারপর স্ক্রিপ্ট পড়ে, বুঝে কাজে নামি।
স্ক্রিপ্ট আগে না পেলে ভাল কাজ করা কঠিন। দু’একজন ডিরেক্টর আছেন যারা ফোনে
গল্পটা মাথায় ঢুকিয়ে দেন, চরিত্রটা বুঝিয়ে দেন।
পরে সেটে গেলে স্ক্রিপ্ট দেন। পারতপক্ষে আমি এ ধরনের কাজ করতে চাই না। এ ধারার
দু’একটি কাজ করা হয়েছে আমার। হয়তো অভিজ্ঞতা দিয়ে উতরে গেছি। কিন্তু এ ধরনের কাজে
অস্বস্তি লাগে। ইনসিকিউরড ফিল করি। কনফিডেন্স বেশি পাইনি।
স্ক্রিপ্ট শুটিংয়ের আগে হাতে না পেয়ে আপনি যার কাজ করেছেন, তিনি হয়তো দক্ষ
পরিচালক। কিন্তু এখন নতুন প্রজন্মের নির্মাতাদের কেউ কেউ তো এ পথ অনুসরণ করছেন।
এতে করে কি নাটকের মান নেমে যাওয়ার আশংকা থাকে না?
যত দক্ষ পরিচালকই হোক না কেন এভাবে কাজ করাটা মোটেও ঠিক না। নাটক আমাদের পেশা,
আনন্দ, ধ্যান-ধারণা, এটাকে হেলাফেলা করে নির্মাণ করা ঠিক না। তবে যদি এ
প্রবণতার জোয়ার শুরু হয় তাহলে তো এক সময় মান নেমে যাবেই।
নির্মাতা ও শিল্পীদের মধ্যে মাঝে মাঝে অমিলের গল্প শোনা যায়। আপনার মতো শিল্পীরা
যখন যথাসময়ের খানিকটা আগে সেটে হাজির হন, তখন নতুনদের কেউ কেউ এ বিষয়ে উদাসীন।
শিল্পীদের কি আসলে এ আচরণ মানায়?
যারা নির্মাতাদের শিডিউন ফাঁসান, বা উদাসীনতার কারণে সিনিয়রদের বসিয়ে রাখেন,
তাদেরকে আমি শিল্পীর কাতারে রাখি না। শিল্পের প্রতি যাদের সত্যিকারের ভালোবাসা
আছে তারা কখনোই এমন কাজ করতে পারেন না। শিল্পীকে সৎ হতে হবে, কাজের প্রতি
কমিটেড হতে হবে। এগুলো যাদের মধ্যে নেই তারা বেশিদিন টিকবে না। আমরা তো এটা পারি
না। নয়টায় কল থাকলে আমরা পৌনে নয়টায় সেটে চলে যাই।
নাটক নিয়েই আপনার ব্যস্ততা। চলচ্চিত্রে সব সময়ই কম কাজ করেছেন। এর কি কোনো
কারণ রয়েছে?
প্রথম দিকে আমার চলচ্চিত্রের কাজ ছিল পড়াশোনার পাশাপাশি। তারপর সংসার হলো। সে
সময় পরিবার সামলাতে গিয়ে অনেক কাজের অফার ফিরিয়ে দিতে হয়েছে। মাঝে চলচ্চিত্রে
অশ্লীলতা শুরু হয়েছিল বলে কাজ করিনি। এখন আবার সুবাতাস বইছে চলচ্চিত্রাঙ্গনে।
তাই কাজ শুরু করেছি। সর্বশেষ আমি এস এ হক অলীকের ‘আকাশ ছোঁয়া ভালোবাসা’ ছবিতে
কাজ করেছি। ভাল কাজ হয়েছে এ ছবিতে।
আপনার বোন ওয়াহিদা মল্লিক জলির কাজ কেমন লাগে?
ও অসাধারণ অভিনয় করে অহিদুজ্জামান ডায়মন্ডের একটি নাটকে ডোম চরিত্রে।
গিয়াসউদ্দিন সেলিমের ‘দুধওয়ালী’, সালাহউদ্দিন লাভলুর ‘রঙের মানুষ’ নাটকে ওর
অভিনয় দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছি। ও শতগুণে আমার চেয়ে, এমনকি অনেকের চেয়ে ভাল শিল্পী।
তবে দুঃখের বিষয়, ওর মতো শিল্পীর মূল্যায়ন যথাযথ হচ্ছে না।
|