|
অনন্য মেধা আর সৃষ্টিশীলতায় বিশ্ব পরিমন্ডলে
বাংলাভাষী মানুষের অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম সত্যজিৎ রায়ের জন্মবার্ষিকী
পালিত হলো গত ৩ মে। ১৯২১ কলকাতায় তাঁর জন্ম। বাংলা চলচ্চিত্রকে বিশ্ব পর্যায়ে
উন্নীত করার এ রূপকারের দৃঢ় পদচারণা কেবল চলচ্চিত্রের প্রতিটি শাখা-প্রশাখায়ই ছিল
না, ছিল শিল্প-সাহিত্যের আরো অনেক পরিমন্ডলে। তিনি ছিলেন একাধারে ফটোগ্রাফার,
পেইন্টার, শিশু সাহিত্যিক ও সঙ্গীতজ্ঞ। সত্যজিৎ রায়ের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে
তাঁর জীবনের নানা বিষয় তুলে ধরা হলো।
চলচ্চিত্র বোদ্ধাদের বিবেচনায় সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রের নাড়ি-নক্ষত্রের সঙ্গে এতোটা
গভীর দখল বিশ্বের খুব কম চলচ্চিত্র নির্মাতার মধ্যেই লক্ষ করা যায়। তাঁর নির্মিত
চলচ্চিত্রগুলোর বেশির ভাগেরই কাহিনীচিত্র লেখা থেকে শুরু করে নিজেই এর কলাকুশলী
নির্বাচন, ক্যামেরা অপারেটিং, শিল্প নির্দেশনা, পরিচালনা, এডিটিং এমনকি ছবিটির
বিজ্ঞাপন উপকরণগুলো তৈরি করতেন। তাই তাঁর প্রতিটি ছবি এতোটা জীবন ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠতে
পেরেছে।
চলচ্চিত্র কতোটা প্রবল ও সফল গণমাধ্যম হয়ে উঠতে পারে তাঁর অনন্য নজির রেখেছেন তিনি।
সাধারণ মানুষের মধ্য থেকেই উঠে এসেছে তাঁর ছবির চরিত্রগুলো। তাদের কথা, আচরণ কখনোই
দুর্বোধ্য হয়ে ওঠেনি। জার্মান কবি হাইনে কিংবা প্রাচীন বাঙালি কবি কালিদাসের সহজ
কিন্তু মর্মস্পর্শী পঙক্তি ‘সুখের লাগিয়া এ ঘর বাধিনু অনলে পুড়িয়া গেল’- এর মতোই
স্বচ্ছভাবে তার কাহিনীচিত্রের বক্তব্য ফুটে উঠেছে।
আর চরিত্রগুলো সহজ সাধারণ হলেও তাঁদের শেকড় সমাজের গভীরে। সত্যজিৎ রায় ছিলেন
বিশ্বের সেরা ১০ চলচ্চিত্র নির্মাতাদের একজন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে
২৮টি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, পাচটি তথ্যচিত্র ও তিনটি টেলিফিল্ম।
তাঁর নির্মিত ছবিগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে পথের পাঁচালী (১৯৫৫), অপরাজিত
(১৯৫৬), পরশ পাথর (১৯৫৭), জলসাগর (১৯৫৮), অপুর সংসার (১৯৫৯), দেবী (১৯৬০), তিন কন্যা
(১৯৬১), রবীন্দ্রনাথ (১৯৬১), কাঞ্চনজঙ্ঘা (১৯৬২), অভিযান (১৯৬২), মহানগর (১৯৬৩),
চারুলতা (১৯৬৪), কাপুরুষ ও মহাপুরুষ (১৯৬৫), নায়ক (১৯৬৬), চিড়িয়াখানা (১৯৬৭), গুপী
গাইন বাঘা বাইন (১৯৬৯), অরণ্যের দিনরাত্রি (১৯৭০), প্রতিদ্বন্দ্বী (১৯৭০), সিকিম
(১৯৭১), সীমাবদ্ধ (১৯৭১), অশনি সংকেত (১৯৭৩), সোনার কেল্লা (১৯৭৪), ইনার আই (১৯৭৪),
জনারণ্য (১৯৭৫), বালা (১৯৭৬), শতরঞ্জ বি খিলাড়ি (১৯৭৭), হীরক রাজার দেশে (১৯৮০),
পিকু (১৯৮২), সদগতি (১৯৮২), ঘরে বাইরে (১৯৮৪), সুকুমার রায় (১৯৮৭), গুশত্রু (১৯৮৯),
শাখা প্রশাখা (১৯৯০), আগন্তুক (১৯৯১)। এছাড়া তিনি বহু চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য রচনা
ও সঙ্গীত পরিচালনা করেন।
লেখক হিসেবেও সত্যজিৎ রায় খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে রয়েছে-
বিষয় চলচ্চিত্র, একেই বলে শুটিং, আওয়ার ফিল্মস দেয়ার ফিল্মস, ফেলুদা সিরিজ, শঙ্কু
সিরিজ, পিকুর ডায়রি ইত্যাদি। সত্যজিৎ রায় পথের পাচালীর জন্য ১৯৯৫ থেকে ১৯৬৬-এর মধ্যে
ভারত ছাড়াও ১১টি আন্তর্জাতিক পুরস্কারসহ তার নির্মিত চলচ্চিত্র অপরাজিত পেয়েছে
ভেনিস, সান ফ্রান্সিসকো, বার্লিন, ডেনমার্কসহ পাঁচটি আন্তর্জাতিক পুরস্কার।
তথ্যচিত্র রবীন্দ্রনাথ ও ইনার আই এবং টিভিচিত্র সদগতিও পেয়েছে দেশ-বিদেশের বহু
পুরস্কার।
এছাড়া ব্যক্তিগতভাবে তিনি পেয়েছেন সম্মান ও পুরস্কার। তিনি ইনডিয়া সরকারের কাছ থেকে
৪০টি পুরস্কার ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ৬০টি পুরস্কার লাভ করেন। এসবের মধ্যে রয়েছে
দেশ-বিদেশের বহু বিশ্ববিদ্যালয়ের অনারারি ডক্টরেট ডিগ্রি, বিশ্বভারতীর দেশিকোত্তম
দাদা সাহেব ফালকে পুরস্কার, ম্যাগসেসে পুরস্কার, ফ্রান্সের লিজিয়ন অফ অনার (১৯৮৭),
বিশেষ অস্কার (১৯৯২) পুরস্কার ইত্যাদি।
সত্যজিৎ রায়ের পূর্বপুরুষের বসবাস ছিল কিশোরগঞ্জ জেলার মসুয়া গ্রামে। তাঁর বাবা
প্রখ্যাত লেখক, সম্পাদক ও ফটোগ্রাফার সুকুমার রায় ছিলেন রয়াল ফটোগ্রাফিক সোসাইটি অফ
গ্রেট বৃটেনের ফেলো। তাঁর মা সুপ্রভা রায় ছিলেন একজন সঙ্গীত শিল্পী ও হস্তশিল্পে
পারদর্শী এবং তাঁর দাদা উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরীও ছিলেন প্রখ্যাত লেখক, শিশু
সাহিত্যিক, পেইন্টার, ফটোগ্রাফার, ব্লক ডিজাইনার ও শিশুতোষ পত্রিকা সন্দেশ-এর
সম্পাদক।
জন্মের মাত্র দুই বছরের মধ্যেই বাবাকে হারিয়ে মামার আশ্রয়ে দৃঢ়চেতা মায়ের
তত্ত্বাবধানে সত্যজিৎ রায়ের শৈশব-কৈশোর অতিবাহিত হয়। কলকাতার বালিগঞ্জ সরকারি হাই
স্কুল থেকে ম্যাট্রিক ও প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে অর্থনীতিতে অনার্সসহ বিএ পাসের পর
১৯৪০ সালে সত্যজিৎ রায় শান্তিনিকেতনে ভর্তি হন।
১৯৪৩ সালে একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থার কমার্শিয়াল আর্টিস্ট হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু
হয়। বিজ্ঞাপনের ভাষা ও ডিজাইনে তিনি নতুন মাত্রা সংযোজন করেন। প্রায় একই সময়ে তিনি
বইয়ের প্রচ্ছদ ও পত্রিকায় ছবি আকা শুরু করেন। ১৯৪৭ সালে কয়েক বন্ধুর সহায়তায় গঠন
করেন কলকাতা চলচ্চিত্র সংসদ। পরবর্তী বছর তাঁর সুযোগ হয় ফরাসি ছবি মেকার জা রেনোয়ার
সঙ্গে পরিচিত হওয়ার।
রেনোয়া তার পরিচালিত দি রিভার ছবির কিছু অংশ কলকাতায় শুটিং করেন এবং
সত্যজিৎ তা দেখেন। পরে চলচ্চিত্র নির্মাণের উদ্দেশ্যে তিনি গঠন করেন কনক
পিকচার্স নামে একটি প্রতিষ্ঠান। সত্যজিৎ এ সময় এ পারফেক্ট ডে নামে
একটি চিত্রনাট্য রচনা করেন।
১৯৫০ সালে চাকরির সূত্রে পাঁচ মাস লন্ডনে অবস্থানকালে তিনি প্রায় একশ ছবি দেখেন এবং
পরিচিত হন বৃটিশ চলচ্চিত্র নির্মাতা লিন্ডসে অ্যান্ডারসন, চলচ্চিত্র বিশেষজ্ঞ
পেনেলোপি হাস্টন এবং গ্যাবিন ল্যাম্বটির সঙ্গে। ইটালির ভিত্তোরিও ডি সিকা পরিচালিত
দি বাইসাইকেল থিফ দেখে তিনি মুগ্ধ হন এবং বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস
পথের পাঁচালী অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন।
একই বছর অক্টোবরে দেশে ফিরে তিনি এর চিত্রনাট্য রচনা করেন এবং ১৯৫২ সালে অপেশাদার
লোকজন নিয়ে ছবির শুটিং শুরু করেন। বহু ধার দেনা, গহনা, বইপত্র ও সঞ্চিত সম্পদ বিক্রি
করেও তিনি চলচ্চিত্রের কাজ শেষ করতে পারেননি।
নিজের জীবন বীমার পলিসি বন্ধক দিয়ে ও বন্ধুবান্ধব-আত্মীয়দের কাছ থেকে তিনি মাত্র ১৭
হাজার ৫০০ টাকা সংগ্রহ করেন। পরে তিনি ব্যয় কম করার জন্য পুরনো ক্যামেরা ভাড়া করেন,
খাদ্য ও যাতায়াত খরচ কমিয়ে দেন এবং কলকাতার প্রত্যন্ত এলাকায় শুটিং করেন।
সত্যজিৎ রায় একজন প্রযোজকের সন্ধান করছিলেন যিনি অন্তত ৪০ হাজার টাকা জোগান দিতে
সক্ষম। ছবির এক-তৃতীয়াংশ চিত্রায়িত হওয়ার পর জোগাড় করা টাকা শেষ হয়ে যায়। বাধ্য হয়ে
তিনি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কাছে অর্থ সাহায্য চান। এ ব্যাপারে আমলাদের অনীহা প্রত্য
করে মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায় ব্যক্তিগতভাবে ছবিটির নির্মাণ ব্যয় সঙ্কুলানের
ব্যবস্থা করেন।
১৯৫৫ সালে পথের পাঁচালী নিউ ইয়র্কে প্রদর্শিত হয় এবং ওই বছরই আগস্টে
কলকাতার সিনেমা হলে প্রদর্শিত হয়। মুক্তির পরপরই ছবিটি সারা বিশ্বে প্রশংসা লাভ করে
এবং পুরস্কার ও সম্মাননা অর্জন করে। ১৯৫৫ সালে পথের পাঁচালী প্রেসিডেন্ট ও
পশ্চিমবঙ্গ সাংবাদিক সমিতির পুরস্কার লাভ করে। ওই বছর ছবিটি ফ্রান্স ইন্টারন্যাশনাল
ফিল্ম ফেস্টিভালে সর্বশ্রেষ্ঠ মানব দলিল হিসেবে জুরি বোর্ডের বিশেষ পুরস্কার অর্জন
করে।
পথের পাঁচালী চলচ্চিত্রটি পৃথিবীর বিভিন্ন শহর ও দেশ যথা
এডিনবরা, ম্যানিলা, স্পেন, সান ফ্রান্সিসকো, বার্লিন, ভ্যাঙ্কুভার, ডেনমার্ক ও
জাপানে পুরস্কৃত হয়। ১৯৫৬-তে মুক্তি পায় তাঁর দ্বিতীয় ছবি অপরাজিত, এটি তাঁকে
এনে দেয় ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসব পুরস্কার, গোল্ডেন লায়ন সিনেমা নুভুয়েল এবং ক্রিটিকস
অ্যাওয়ার্ড।
১৯৫৬ থেকে ১৯৯২-এর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত চলচ্চিত্র মিশে ছিল তাঁর চিন্তা ও কাজে।
ব্যক্তিগত জীবনে সত্যজিৎ রায় ১৯৪৯ সালে কাজিন বিজয়া দাসকে বিয়ে করেন। তাঁদের
একমাত্র সন্তান সন্দ্বীপ রায় বাবার মতো না হতে পারলেও তিনি একজন খ্যাতিমান
চলচ্চিত্র নির্মাতা। ১৯৯২ সালের ২৩ এপ্রিল কলকাতায় সত্যজিৎ রায়ের মৃত্যু হয়।
|