|
আমাদের যান্ত্রিক জীবনযাপনে বিনোদন যখন
আরাধ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছিল তখন ভিন্নরকম বিনোদনের বার্তা নিয়ে উপস্থিত হয়েছে
এফএম রেডিও। স্বল্প সময়ে তা জনপ্রিয়তাও পেয়েছে। আর এফএম এর কথা বললেই যাদের কথা
অবধারিতভাবে চলে আসে তারা হলেন রেডিও জকি বা আরজে।
তেমনি তিনজন আরজে নীরব (রেডিও টুডে), নুদরাত (রেডিও ফুর্তি) ও তৌফিকা (রেডিও
আমার) তারা কথা বলেছেন এফএম সম্পর্কিত নানা বিষয় নিয়ে। আলোচনার চুম্বক অংশ তুলে
ধরা হলো এখানে। যারা নিয়মিত রেডিও শোনেন বা যারা কালেভদ্রে শোনেন আবার যারা
কখনওই শোনেননি তারাও বোধকরি এই ‘রেডিও জকি’ বা ‘আরজে’ শব্দটির সাথে পরিচিত।
ক্যাজুয়াল ভাষায়, ভিন্নধর্মী টকিং স্টাইলের কারণে এখন এফএম রেডিও চ্যানেলগুলো
বেশ জনপ্রিয়। স্বভাবতই রেডিও জকিরা বা আরজে’রাও বেশ জনপ্রিয় ও শ্রোতাধন্য।
প্রথমেই একটি আলোচিত-সমালোচিত বিষয় তুলে ধরা হলো তিন আরজে’র সামনে।
বিষয়টি হলো রেডিও জকিরা কথা বলে বেশ ক্যাজুয়াল ভাষায়, ইংলিশ বাংলা মিশিয়ে। আজকাল
বিষয়টি নিয়ে আজকাল বেশ জোরেসোরে আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। তবে আলোচনা-সমালোচনার
গতানুগতিক জোয়ারে গা না ভাসিয়ে যুক্তি-তর্কের বলয়ে এই বিষয়টি বিশ্লেষণ করাই ভালো।
এ বিষয়ে নীরবের উত্তর হলো, ‘আমি এই প্রশ্নের উত্তরে আরেকটি প্রশ্ন করতে চাই। যারা
এরকম সমালোচনা করছে তারা কী বাংলা ভাষা সম্পর্কে অগাধ জ্ঞান রাখে বা তারা কী জানে
বাংলা ভাষায় মূল শব্দ কয়টি। আমার মনে হয় না তাদের সংখ্যা খুব বেশি হবে।’
নুসরাত বললেন, ‘যারা সমালোচনা করছে তাদের সংখ্যা কি খুব বেশি। আমার মনে হয় না যে
নির্বিচারে সবাই এই বিষয়ে সমালোচনা করছে। যদি ভাষার কথা বলাই হয় তাহলে আমাদের
দেশে অনেক প্রতিষ্ঠিত শিল্পী আছেন যারা বিকৃত বাংলা ভাষায় গায়।
তাদেরতো কেউ কিছু বলে না। আমরা কি তাহলে জনপ্রিয়তার কারণেই সমালোচনার শিকার হচ্ছি।’
তৌফিকা বললেন, ‘আমরা রেডিও জকিরা খুব স্বাভাবিক, সাবলীল ভাষায় কথা বলি। এর
উদ্দেশ্য হচ্ছে শ্রোতারা যাতে আমাদের বন্ধু ভাবতে পারেন। যাতে তাদের মনে যেন একটা
ভাবনা আসে যে আমি তার পাশেই আছি।
তাতে কমিউনিকেশনটা অনেক সহজর হয়। সেজন্যই কিন্তু এই সহজ সাবলীল ভাষায় কথা বলা।’
নীরব যোগ করলেন, ‘আমি বাংলা ব্যকারণে পড়েছি, ভাষার একটা নিয়ম আছে। গ্রহণ করা ও
বর্জন করা। আমার বাংলা ভাষা কী করবে, কিছু জিনিস গ্রহণ করবে আর কিছু জিনিস বর্জন
করবে।
আমার বাংলা ভাষা কী করছে, গ্রহণের ক্ষেত্রে কিছু ইংরেজি আর কিছু হিন্দি গ্রহণ
করেছে। ইংরেজি হলো ব্যবসার ভাষা আর হিন্দি হলো সংস্কৃতির ভাষা। তাই দুটোই তো
প্রয়োজন। তবে আমাদেরও সংস্কৃতি আছে বলে আমরা হিন্দিকে সেরকমভাবে গ্রহণ করি না।
কিন্তু ইংরেজি গ্রহণ না করার তো কোনো মানে নেই। প্রথমত বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়তে
হলে ইংরেজি প্রয়োজন, কারণ ইংরেজি হলো আন্তর্জাতিক ভাষা। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে
ইংরেজি তো আসতেই পারে। আর আমরা দৈনন্দিন জীবনেও তো ইংরেজি ব্যবহার করি।
এমন কাউকে কি পাওয়া যাবে যে দু-একটি ইংরেজি ব্যবহার করে না। অন্তত চেয়ারকে কেদারা
বলে এমন মানুষও বোধকরি পাওয়া প্রায় অসম্ভব। তাই আমার মনে হয় সহজ সাবলীলতার বিচারে
আমরা যা করছি, তাতে বাংলা ভাষা ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।’
নুসরাতের শেষ যুক্তি ঠিক এমন, ‘আসলে সব কথার শেষ কথা হলো, আমরা দৈনন্দিন জীবনে
যতটুকু ইংরেজি ব্যবহার করি ততটুকু ব্যবহার করলে কোনো দোষ আছে বলে আমি মনে করি
না। তবে অতিরঞ্জিত কোনো কিছুই ভালো নয়।’ তার সাথে একমত পোষন করলেন তৌফিকা।
নীরব এই বিষয়ে তার যুক্তির যবনিকা টানলেন এভাবে, ‘যাহা বলিব সত্য বলিব, বাংলা
ভাষা ব্যবহার করিবো। যেসব জায়গায় আমার আমাদের জীবনযাপনেও ইংরেজি ব্যবহার করি
সেটুকু ব্যবহারে কোনো ক্ষতি নেই, বরং করাই উচিত। তবে অহেতুক সমালোচনা করা জ্ঞানী
মানুষের কাজ নয়।
আর এই ভাষার মিশেল কোনো দূরারোগ্য ব্যাধি নয় যে একে বন্ধ করতে উঠে পড়ে লাগতে হবে।’
এই আড্ডায় যারা উপস্থিত হয়েছেন তারা সবাই প্রথম প্রজন্মের আরজে। আমাদের দেশে এই
এফএম রেডিও বা আরজে কালচার খুব বেশিদিনের নয়।
কিন্তু সেই বিচারে খুব দ্রুতই এটি জনপ্রিয়তা অর্জনে সক্ষম হয়েছে। আর প্রথম
প্রজন্মের আরজে হিসেবে এর ভবিষ্যত কেমন? এই প্রশ্নের উত্তরে নীরব বলেন, ‘আরজে
হিসেবে বাংলাদেশে প্রথম নিয়োগপত্রটা আমার পাওয়া। তখন আমার সামনে কোনো উদাহরণ ছিলো
না।
তাই খুব কষ্ট করতে হয়েছে। কিন্তু যারা পরে আসবে তাদের সামনে অরেক অনুসরণীয় থাকবে।
ফলে তাদের সেই কষ্ট করতে হবে না। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে এই পেশার ভবিষ্যত বেশ ভালো।
তবে এই ভালো বজায় থাকবে যদি স্টেশনগুলো তাদের কর্মীদের পর্যাপ্ত সাপোর্ট দেয়।’
তৌফিকা বললেন, ‘প্রথমে আরজে হওয়াটা অনেকে শখের বশে নিয়েছিলেন। আমাদের ক্ষেত্রেও
তাই ঘটেছিলো।
তবে এখন পেশা হয়ে গেছে। সামনে যারা এই পেশায় আসবে তারা যদি পেশাদারিত্বের সাথে
ভালোবাসা নিয়ে কাজ করে তবে অনেকদূর যেতে পারবে।’
নুদরাত বললেন, ‘শুধুমাত্র আরজে নয় রেডিও সংশ্লিষ্ট সকল পেশারই ভবিষ্যত খুব ভালো।
কারণ এখন এফএম দেশের একটা নির্দিষ্ট অংশে আছে। এটি ক্রমান্বয়ে সারাদেশে ছড়িয়ে
পড়বে। তখন আরো অনেক লোকবলের প্রয়োজন হবে।
সেই বিচারে এর ভবিষ্যত ভালো বলেই মনে হয়।’ তবে যুক্তি-তর্কের বিচারে যাই বলা হোক
না কেন, বর্তমান যান্ত্রিকতার যুগে এফএম রেডিও যে আমাদের বিনোদনের অনন্য মাধ্যমে
পরিনত হয়েছে সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। আর সেজন্য আরজে’দের কৃতিত্ব বলাই
বাহুল্য।
|