|
ঢাকার জনগোষ্ঠীর চল্লিশ
শতাংশ দারিদ্রসীমার নিচে বসবাসকারী স্বল্প আয়ের মানুষ এবং এক
বিশাল মধ্যবিত্ত শ্রেণী। ঢাকার আবাসন ব্যবস্থাপনায় বেসরকারী
উন্নয়নকারীদের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। সঙ্গত বাণিজ্যিক কারণেই
তাদের ভোক্তা তালিকার অধিকাংশ উচ্চবিত্ত। তাই আবাসন সমস্যার
ক্ষেত্রে বিশেষভাবে নজর দিতে হবে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত
মানুষের দিকে।
জানতে হবে তাদের ক্রয়ক্ষমতা। প্রণয়ন করতে হবে এই ক্রয়ক্ষমতার
সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বাসা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা। আবাসন
বাজারে এই বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর প্রবেশ নিশ্চিত করতে স্বল্প সুদে
দীর্ঘমেয়াদী গৃহঋণ এবং গৃহ সঞ্চয় প্রকল্প জাতীয় উদ্যোগ।
এক্ষেত্রে উল্লেখ্য, একজন বস্তিবাসী প্রতিমাসে বাড়িভাড়া
হিসাবে প্রতি স্কয়ার ফিটে ব্যয় করে ৮ থেকে ১০ টাকা, যা যেকোন
অভিজাত এলাকার বাড়ি ভাড়ার সাথে তুলনীয়। অপরিকল্পিত ও
অস্বাস্থ্যকর বস্তিগুলোর বিরূপ প্রভাব ঢাকার পরিবেশ ও
সামাজিক প্রেক্ষাপটে লক্ষণীয়। ঘিঞ্জি, ছাপড়া ঘরগুলো ঢাকার
কেন্দ্রে অনেকখানি জায়গা জুড়ে আছে।
সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে আরও অল্প জায়গায় এই বস্তিবাসীদের
বাসস্থানের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতেও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বাসস্থানের
জন্য অনেক প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। এক্ষেত্রে প্রয়োজন
সরকারী উদ্যোগ ও সদিচ্ছা। ঢাকা শহর বিশ্বের অন্যতম একটি
ঘনবসতিপূর্ণ শহর। উপরন্তু পরিকল্পনাহীনভাবে বেড়ে ওঠার কারণে
জনজীবন বিপর্যস্ত।
ঢাকা শহরের জমির স্বল্পতার কথা বিবেচনা করে প্রশ্ন আসে ‘এখনও
সরকারী বা বেসরকারী উদ্যোগে একজন ব্যক্তিকে ৩/৫ কাঠার প্লটের
বরাদ্দ দেয়া কি যুক্তসঙ্গত?’ বিশেষত, সরকারী ভূমি উন্নয়ন
প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে জমি দেয়া হয় ব্যক্তি-বিশেষকে? জমির
মালিক ও বেসরকারী উন্নয়নকারীদের যৌথ উদ্যোগে যে ফ্ল্যাট বাড়ি
তৈরি হয় তা স্বভাবতই চলে যায় মধ্যবিত্তের ক্রয়মতার বাইরে।
লাভবান হন জমির মালিক ও উন্নয়নকারী। সরকারী ও বেসরকারী
উদ্যোগের সমন্বয়ে স্বল্প মূল্যের ফ্যাট তৈরি করা সম্ভব, যা
বিশাল মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বাসস্থান নিশ্চিত করতে পারবে। আবাসন
প্রকল্পগুলোর স্থান নির্বাচন নিয়ে অনেকদিন ধরেই আলোচনা হচ্ছে।
ঢাকার জলাভূমি ও উর্বর কৃষি জমিগুলো এখন বেসরকারী ভূমি
উন্নয়নকারীদের দখলে। সুনির্দিষ্ট আইন ও নীতিমালাকে উপেক্ষা
করেই এই প্রকল্পগুলো ক্রমশ বিস্তার লাভ করছে। পরিবেশের উপর
এর বিরূপ প্রভাব সর্বজনবিদিত। ঢাকার অবকাঠামোমূলক পরিকল্পনায়
এ আবাসন উপযোগী উঁচু এলাকায় গৃহায়ণ প্রকল্প করার ব্যাপারে
দিক নির্দেশনা দেয়া আছে।
বৃহত্তর ঢাকার উঁচু ভূমিগুলো অনেক ক্ষেত্রে শহরের কেন্দ্র
থেকে কিছুটা দূরে। পরিকল্পিত
Infrastructure Ges mass
transit
এর ব্যবস্থা করলে জনগণ ও
উন্নয়নকারী এই সকল এলাকার দিকে আকর্ষিত হবে। ঢাকা তথা
বাংলাদেশে মানুষের তুলনায় জমির পরিমাণ অল্প।
এই পরিপ্রেক্ষিতে ভূমি ব্যবহারে কৃচ্ছতা প্রয়োজন। নগর
পরিকল্পনায় 'পরিপূর্ণ নগর পরিকল্পনা' অনেক শহরেই প্রয়োগ করা
হচ্ছে। ছোট পরিসরে ফ্ল্যাটের নকশা এবং সকল নাগরিক সুবিধাদিসহ
অল্প জায়গায় গৃহায়ণ প্রকল্পগুলোর পরিকল্পনা করা এ যুগের
স্থপতি ও পরিকল্পনাবিদদের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ।
ঢাকা শহরে ফ্যাট কিংবা জমির দাম আকাশচুম্বী। আবাসন বাজারের
উপর সরকারী নিয়ন্ত্রণ খুবই সামান্য। বৃহত্তর ঢাকায় একটি
ফ্যাটের মালিক হওয়া মধ্যবিত্ত শ্রেণীর স্বপ্নেরও বাইরে।
অন্যদিকে এক শ্রেণীর উচ্চবিত্তবানদের জন্য জমি বা ফ্ল্যাট
কেনা লাভজনক একটি বিনিয়োগ হিসেবে গণ্য। জমি বা ফ্ল্যাটের দাম
অস্বাভাবিক বৃদ্ধির পেছনে যে কয়টি কারণ আছে, তার মধ্যে
অন্যতম জমির উপর করারোপের নীতিমালা।
শহর এলাকায় খালি জায়গার উপর কর খুবই সামান্য, তাই প্রচুর জমি
বছরের পর বছর খালি পড়ে থাকে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে
Land ceiling act, capital
gain tax অথবা
গিফট ট্যাক্স প্রয়োগ করা হয়
land speculation
রোধ করার জন্য। ঢাকায়
জমির সুষ্ঠু বন্টন ও বিভিন্ন শ্রেণীর জনগণের মধ্যে সমতা আনতে
এসব ট্যাক্সেশন টুলগুলো প্রয়োগ করা যেতে পারে।
সর্বোপরি এই শহরের ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে অবশ্যই খেয়াল রাখতে
হবে শহরের ধারণক্ষমতার দিকে। বৃহত্তর ঢাকার দিকে গ্রাম ছেড়ে
ছুটে আসা মানুষের আকর্ষণ কমাতে হলে প্রয়োজন গ্রাম ও
শহরকেন্দ্রিক জীবনযাত্রার মান বিষয়ে তুলনামূলক ভারসাম্য নিয়ে
সামগ্রিকভাবে চিন্তা করা।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ,
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়
|